গরিবের স্বপ্ন কি সহজে পূরণ হয়!

প্রকাশ | ১৭ মার্চ ২০১৯, ০০:০০

গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

‘মাইনষের কত কিছু করার স্বপ্ন থাকে। ব্যবসা, বাণিজ্য, গাড়ি-বাড়ি, টেকা-পয়সা আরো কত কী! তয় আমার স্বপ্ন আছিন বাড়িত একটা সাইট-পাক্কা টিনের ঘর করার। কিন্তু চা, পান, সিগারেট বেইচ্যা যে টেকা কামাই করি সবডা সংসারের পিছে লাইগ্যা পড়ে। ঘর করনের টেকা আর জমাইতে পারি না। কয়েক বৎসর আগে চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে সরকারি ঘর চাইছিলাম। কইছে বাও কইর‌্যা দিব। পরে আর ঘর বাও অয় নাই। বুজলেন মিয়া ভাই, গরিবের স্বপ্ন অত সহজে পূরণ হয় না। তয় অহন চেষ্টায় আছি গেরামে একটা চায়ের দোহান দিবার। কেরে জানি হেইডার টেকাও জমাইতে পারতাছিনা।’

প্রতিদিনের সংবাদের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ভ্রাম্যমাণ হকার তোতা মিয়া (৬০)। তার বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুরের রামগোপালপুর ইউনিয়নের নওয়াগাঁও গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মল্লিক মিয়ার ছেলে। জীবিকার তাগিদে শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরে ঘুরে চা, পান ও সিগারেট বিক্রি করেন তিনি। গত শুক্রবার বিকেলে তোতা মিয়ার দেখা মিলে গৌরীপুর শহরের হাতেম আলী সড়কে। তার এক হাতে দুটি চায়ের ফ্লাক্স ও বালতি, অন্য হাতে ঝুলানো চায়ের কাপ ও পান-সিগারেটের ব্যাগ। ‘এই চা গরম, চা গরম’ পান-সিগারেটও সঙ্গে আছে’ এই কথাগুলো বলে ছুটে চলেছেন সড়কের পথ ধরে। কেউ ডাক দিলে থামছেন তিনি। চা কিংবা পান, সিগারেট বিক্রি শেষে আবারও হেঁটে চলেছেন সড়কের পথ ধরে।

দূর থেকে হাতের ইশারায় ডাক দিতেই থেমে পড়েন তোতা মিয়া। কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন কী চা দিমু, দুধ না লাল। লাল বলতেই দ্রুত চা নিয়ে আসেন তিনি। চা খেতে খেতে তোতার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প হয় এ প্রতিনিধির। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন ‘অভাবের কারণে লেহাপড়া করি নাই। ছোড থাকতেই মাইনষের কাজ-কাম কইর‌্যা পেট চালাইছি। অহন বয়স অইছে। শইলে মেলা রোগ-বালাই। আগের মতো খাটা-খাটনি করবার পারি না। তয় ঘরে বইয়া থাকলে ভাত-ওষুধ কে দিব। সেই জন্য এই ব্যবসায় নামছি।’

প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে চা, পান ও সিগারেট বিক্রি করে তোতা। চা প্রতি কাপ পাঁচ টাকা, পানপ্রতি খিলি পাঁচ টাকা, সিগারেট রয়েছে বিভিন্ন দামের। দিন শেষে বিকিকিনি করে তার লাভ হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকার মতো। তবে এই সামান্য টাকায় তার সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

সহায়-সম্বলহীন তোতা মিয়ার নিজ ভিটেতে জরাজীর্ণ একটি ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। পারিবারিক জীবনে তার এক স্ত্রী, এক ছেলে, ছেলের বউ ও দুই নাতি রয়েছে। কিন্তু একমাত্র ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ায় কোনো কাজ করতে পারে না। তবে ছেলের বউ একটি ফ্যাক্টরিতে সামান্য বেতনে কাজ করে সংসারের হাল ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।

তোতা মিয়ার জীবনের নানা রকম কথা শুনতে শুনতে বিকেল বেলাটা সন্ধ্যায় গড়িয়েছে। মসজিদে বেজে ওঠেছে আজানের ধ্বনি। এমন সময় মিলন মিয়া নামে এক পথচারী তোতার সামনে এসে এক চা দিতে বলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মিলন বলেন, ‘মুরুব্বি আপনি এই বয়সে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন কেন? আপনার সন্তানরা কি ভাত-কাপড় দেয় না। কথার রেশ টেনে তোতা বলেনÑ সন্তান তো প্রতিবন্ধী। হে আর কি ভাত-কাপড় দিব। তাই পেটের দায়ে ঘুরি গো বাজান। তয় গেরামে একটা ছোড দোকান দিতে পারলে আমার শইলডা জিরান পাইত। কিন্তু টেকার অভাবে পারি না।’

 

"