বাকপ্রতিবন্ধী অদম্য মিনারা

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০

ভোলা প্রতিনিধি

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় সাগর মোহনায় জেগে উঠা একটি ইউনিয়ন ঢালচর। সেখানকার মানুষ সাগরের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকে। প্রায় ১২ হাজার লোকসংখ্যার এই দ্বীপ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষই মৎসজীবী ও কৃষিজীবী। এদের একটা বড় অংশই শিশু। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র্যতার কারণেই অল্প বয়সেই স্কুলের গ-ি পেরোনের অগেই ঝরে পড়ে। কিন্তু ব্যতিক্রম আশিংক বাকপ্রতিবন্ধী কিশোরী মিনারা বেগম (১৪)। পড়াশোনা প্রতি তার প্রবল আগ্রহের কাছে পরাজিত হয়েছে দরিদ্র। মিনারা পশ্চিম ঢালচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। বাবা হোসেন মিয়া দিন মজুর। মা খাদিজা বেগম একজন গৃহিণী। তাদের একমাত্র মেয়ে মিনারা। অভাব অনটন যাদের নিত্যসঙ্গী।

মিনারা ছোট থেকেই সামান্য বাকপ্রতিবন্ধী। মায়ের ইচ্ছায় স্কুলে ভর্তি হয়। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু দরিদ্রতার কাছে সে হার মানেনি।

মিনারা ছিল কোস্ট ট্রাস্ট (আইসিএম) প্রকল্পে ‘ময়না কিশোরী ক্লাব’ এর সক্রিয় সদস্য। ওই সংগঠনের ইউসি গিয়াস উদ্দিন মিনারার অসচ্ছলতা ও পড়াশোনা প্রতি আগ্রহ দেখে বৃত্তির ব্যবস্থা করে। ‘শিশু সুরক্ষা বৃত্তি’র ১৫ হাজার টাকা দিয়ে মিনারা সেলাই মেশিন কেনে। সেলাই মেশিনের চাকায় স্বপ্ন ঘুরতে শুরু করে মিনারার।

মিনারার মা খাদিজা বেগম বলেন, মেয়েকে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম। ওর পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ রয়েছে। এখন কোস্ট ট্রাস্ট ও ইউনিসেফ ওর পাশে দাঁড়িয়েছে। এখন মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখি। মিনারা এখন পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাইয়ের কাজ করে। পাশাপাশি আমিও সেলাই করি। যে টাকা আয় হয় তা দিয়ে ওর পড়াশোনর খরচও চলে। আবার সংসারের ছোটখাটো খরচও চালিয়ে নিতে পারি। কিছু টাকা দিয়ে ছাগল কিনেছি।

কোস্ট ট্রাস্ট আইইসিএম প্রকল্পের ইউসি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ঢালচরে দরিদ্রতা, বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা, অসহায় এতিম, প্রতিবন্ধী এমন ১১ জন শিশুকে আমাদের প্রকল্প থেকে ‘শিশু সুরক্ষা বৃত্তি’র সহায়তা পেতে সহযোগিতা করছি। এই সহয়তা পেয়ে সবাই এখন স্কুলে পড়াশোনা করছে। পারিবারিকভাবে এই পরিবারগুলো অর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। ফলে ইউনিয়নে ঝরে পড়ার হার কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারছি। পশ্চিম ঢালচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম বলেন, আমরা মিনারার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে আমার স্কুলে কোনো ফি নেই না। প্রয়োজনে আমরা ওকে বিভিন্নভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহযোগিতা করে যাচ্ছি। ইউনিয়নের ঢালচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, মিনার বাবা একজন দিনমুজুর। সেই পরিবারে মেয়ে মিনারার পড়াশোনার যে এত আগ্রহ তাতে আমি অভিভূত। তাই ওর কথা চিন্তা করে আমরা সরকারিভাবে সহায়তা হিসেবে ভিজিএফের সুবিধা দিচ্ছি ওদের পরিবারকে। যাতে ওর পড়াশোনা বন্ধ না হয়। মিনারার মতো যেসব পরিবার আছে আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সবার পাশে থাকার চেষ্টা করব। কোস্ট ট্রাস্ট আইইসিএম প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. মিজানুর রহমান জানায়, মিনারাদের মতো দরিদ্র ও এতিমরা শিশু বিবাহের ঝুঁকিতে আছে। সর্বমোট ৫০৮ জন কিশোরীর মাঝে এককালীন ১৫ হাজার টাকা করে বৃত্তি প্রদান করেছি। এই টাকা পেয়ে স্ব স্ব কিশোরী এখন স্বাবলম্বী। এর মাধ্যমে অনেকাংশেই শিশু বিবাহ কমিয়ে আনার পাশাপাশি সচ্ছলতাও হয়েছে অনেকের পরিবারের। ভোলা জেলা প্রশাসক মো. মাসুদ আলম ছিদ্দিক বলেন, পিছিয়ে পড়া ও ঝরে পরা রোধে শিশু সুরক্ষা বৃত্তি প্রশংসনীয়। আমি আশা করি সরকারের পাশাপাশি তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখবে। এতে ঝরে পড়া হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

 

"