জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা

মুরাদনগরে কেন্দ্র খরচের নামে ৪০ লাখ টাকা আদায়

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০

মুরাদনগর (কুমিল্লা) সংবাদদাতা

কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় চলমান জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে ৯০ প্রতিষ্ঠনের ১৩ হাজার ৩৭৭ জন পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রবেশপত্র বিতরণের সময় কেন্দ্র খরচের নামে প্রতিষ্ঠানভেদে ২০০-৫০০ টাকা করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। রহস্যজনক কারণে অর্থ আদায়ের বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে বলে অভিভাবকমহল অভিযোগ তুলেছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় ৯০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ৫৪ স্কুল ও ৩৬টি মাদ্্রাসা এবং পরীক্ষা কেন্দ্র ১৭টি। জেএসসির ১২টি কেন্দ্রে ১১ হাজার ৭৬ জন, জেডিসি ৪টি কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৭ জন ও এসএসসি ভোকেশনাল নবম শ্রেণির ১টি পরীক্ষা কেন্দ্রে ২২৬ পরীক্ষার্থীসহ মোট ১৩ হাজার ৩৭৭ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্র খরচের দোহাই দিয়ে আদায় করে। সরেজমিনে গিয়ে কমপক্ষে ১৫টি স্কুলের অভিভাক ও পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়।

অর্থ আদায়ে অভিযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগগুলো হলো, দারোরা ডিনেশ উচ্চ বিদ্যালয়, বাঁশকাইট পিজে উচ্চ বিদ্যালয়, রামচন্দ্রপুর আকব্বরের নেছা উচ্চ বিদ্যালয়, পরমতলা শব্দরখান উচ্চ বিদ্যালয়, ধনীরামপুর ডিএসওয়াই উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে ৫০০ টাকা, চাপিতলা অজিফা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪০০, মোচাগড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, কাজিয়াতল রহিম রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, জাহাপুর কে কে স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হাঁটাশ উচ্চ বিদ্যালয়, রামচন্দ্রপুর রামকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৫০, বাইড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ২৫০, যাত্রাপুর উচ্চ বিদ্যালয় ২২০, নূরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম উচ্চ বিদ্যালয়, কামাল্লা ডিআরএস উচ্চ বিদ্যালয়, কোরবানপুর জিএম উচ্চ বিদ্যালয়গুলোয় ২০০, শুশু- ইসলামিয়া আলিম মাদ্্রাসায় ৩০০, রামচন্দ্রপুর, দিঘিরপার, খামারগ্রাম, আকবপুর, কুড়াখাল কুরুন্ডি, পেন্নই, দৌলতপুরÑএই ছয়টি মাদ্্রাসার পরীক্ষার্থী থেকে ৪৫০ টাকা প্রবেশপত্র ফি নেওয়া হয়েছে।

রামচন্দ্রপুর সোনা মিয়া মোল্লা দাখিল মাদ্্রাসার সুপার মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্র সোনাকান্দা মাদ্্রাসায়। এবার এখানে আটটি মাদ্্রাসার মোট ৪৪৩ ছাত্র পরীক্ষা দিচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারও পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে কেন্দ্রসচিব হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই ছাত্রপ্রতি ৪৫০ টাকা করে কেন্দ্র খরচ নির্ধারণ করা হয় এবং পরীক্ষার শুরুতেই সেই টাকা কেন্দ্রসচিবকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাঁশকাইট পি.জে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিন ৫০০ টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, কেন্দ্র ফি, বেঞ্চ তৈরি ও বেতনের টাকা মিলে এ টাকা নেওয়া হয়েছে।

মুরাদনগর ডি. আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহজাহান বলেন, ‘আমার স্কুল থেকে ১১২ জন জেএসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমরা প্রবেশপত্রের নামে একটি টাকাও নেইনি।’

পরমতলা শব্দর খান উচ্চ বিদ্যালয়, দারোরা দীনেশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও আকবপুর ইয়াকুব আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের প্রবেশপত্রের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে তারা অস্বীকার করেন। তবে শিক্ষার্থীরা বলছে, প্রবেশপত্র বাবদ বিদ্যালয়ে ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে অন্তত ২০ শিক্ষক বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে পরীক্ষার প্রবেশপত্র বিলি করার সময় পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। জেলা থেকে প্রশ্নপত্র আনা বাবদ পাঁচ হাজার, বড় স্যারদের কেন্দ্র বিজিট সম্মানী ৮-১২ হাজার। অন্যান্য খরচ পাঁচ হাজার টাকাÑসব মিলিয়ে ১৮-২২ হাজার টাকা খরচ হয়। শিক্ষকরা আরো বলেন, মাধ্যমিক কর্মকর্তা শফিউল আলম তালুকার ২০১০ সালে এই উপজেলায় এসে ২০১৪ পর্যন্ত চাকরি করেন। পরে অন্যত্র বদলি হলে আবার ২০১৭ সালে তদবির করে এই উপজেলায় আসেন। এসেই ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন তিনি।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৫০ টাকা কেন্দ্র ফি বাবদ নিতে পারে, এর বেশি নেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। যদি এটা কেউ করে থাকে, তাহলে এর দায়ভার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। দীর্ঘদিন এই উপজেলায় চাকরি করে ফের আসার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনস্বার্থে আমাকে সরকারিভাবে এখানে বদলি করা হয়েছে।

মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিতু মরিয়ম বলেন, সরকার কর্তৃক সম্মানী নির্ধারিত আছে। কোনো বিদ্যালয় প্রবেশপত্রের নামে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে বিষয়টি আমার নলেজে নেই। কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মো. আবদুল মজিদ বলেন, প্রবেশপত্রের নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান টাকা নেয়, তাহলে সে নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।

 

"