স্বাধীনতা বাঙালির তুঙ্গস্পর্শময় ঘটনা

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৮, ০০:৫০

হাসান আজিজুল হক

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কম বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়নি। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কোনো স্বাধীন জাতি তার দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায় না, বিভ্রান্তিতে পড়ে না। কিন্তু আমাদের বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে। তবে ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই সঠিক ইতিহাস বের হয়ে আসে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রম ছড়ানো হয়েছে, তাও কালের নিয়মেই মুছে যাবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিভ্রম থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে বিকৃতচর্চা করা হয়েছিল, তার অনেকটাই এখন দূর হয়েছে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের সন্তানরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।

আমি নিজে স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখার যে অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে, তা আমার অনেক বড় সম্পদ বলেই মনে করি। এ নিয়ে অবশ্য আমি বই লিখেছি। এখনো নানাভাবে বলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি খুলনার দৌলতপুর কলেজে শিক্ষকতা করতাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে সপরিবারে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তার এ দেশীয় সাঙ্গপাঙ্গরা বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। নিজের চোখে দেখেছিÑকত মানুষ হত্যা করে ফেলা রাখা হয়েছে। লাশের পর লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে বীভৎস হয়ে। সেই দৃশ্য কখনো ভুলার নয়। যারা দেখেছেন তারা কোনোদিনই ভুলতে পারবে না বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কী নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল বাঙালিদের ওপর।

একটি জাতি শৃঙ্খলামুক্ত হওয়ার পর, স্বাধীনতা লাভের পর সেই জাতির বহুমুখী বিকাশ ঘটে। মনের বিকাশ ঘটে, শিক্ষার বিকাশ ঘটে, সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। পরাধীন জাতির কপালে এসব জোটে না। পরাধীন থাকতে থাকতে তার সার্বিক অবস্থা আরো অবনতিশীল হয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি। এর সঙ্গে এখন অনেক কিছু পাওয়ার বিষয়টি জড়িয়ে গেছে। সেগুলো না পেলে স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না। আমাদের পরে স্বাধীনতা অর্জন করে অন্য দেশ যতটা সমৃদ্ধ লাভ করেছে, বাংলাদেশ সেটা পারেনি। এই না পারাটার জন্য গভীর কারণ লুকিয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিশেষভাবে অর্থবহ হবে, যদি না রাষ্ট্রে সমতা কার্যকর হয়, সম্পদের সুষম বণ্টন হয়। বৈষম্য দূর হয়। রাষ্ট্রের উচিত, এই রাষ্ট্রের যারা জন্ম দিয়েছে সেই সাধারণ মানুষ, তাদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা।

বাংলাদেশকে স্বাধীন কারা করেছে? এ দেশের জনমানুষ। তারাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তারাই রক্ত দিয়েছেন। এক সাগর রক্ত দিয়েছেন। ৩০ লাখ শহীদ তারাই। সুতরাং জনমানুষকে বঞ্চিত করে স্বাধীনতা কতটুকু অর্থবহ হতে পারে!

স্বাধীনতা লাভ হলো বাঙালি জাতির চরম গৌরবের বিষয়। তুঙ্গস্পর্শময় ঘটনা। স্বাধীনতার বয়স ৫০ বছর ছুঁতে যাচ্ছে। এখন কিন্তু পেছন ফিরে তাকানোর সময় এসেছে। পেছন ফিরে না তাকালে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতা লাভের যে উন্মাদনা ছিল তা অনেকটা কেটে গেছে। সেখানে একটি স্থিতি আবরণ পড়েছে। রাষ্ট্রকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে তার অতীতে ভুলভ্রান্তিগুলো শুধরে চলতে হবে।

২.

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের যারা বিরোধিতা করেছিল। বিশেষ করে এ দেশীয় কিছু লোক। তাদের শাস্তি হওয়ার ঘটনায় আমি স্বস্তিলাভ করেছি। অনেকেই হয়তো আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন এদের শাস্তি হবে কি না? এটা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রগাঢ় সংশয় ছিল। তারা দেখেছেন, পাকিস্তানিদের এ দেশীয় সাঙ্গপাঙ্গদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর এটি একটি বড় অর্জন বলে মনে করি। এ অর্জনের সঙ্গে বাকি অর্জনগুলোও আমাদের সঞ্চিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের ভেতর থেকে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, তারা লক্ষ্য করেছি, কীভাবে দেশ স্বাধীনতা লাভের জন্য উন্মুখ হয়ে উঠছে। কীভাবে ক্রমাগত দেশ স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। দেশ যখন স্বাধীন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে যেদিন প্রথম শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েছিলামÑসেই দিনটাই কী ভুলতে পারি? পারি না। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করেছেন, তারাও সেদিন দেশের স্বাধীনতার খবরে আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়েছেন। আনন্দের অশ্রুধারা তাদের দুগাল বেয়ে পড়েছে। যেমন পড়েছিল আমার।

৩.

বঙ্গবন্ধু যে ছয় দফা দিয়েছিলেন, তাতে পাকিস্তানি জান্তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। পাকিস্তানি জান্তা যদি আমাদের ছয় দফা মেনে নিত তাহলে বলা যায়, কার্যত আমরা স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম। এ দফাগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার সব উপাদনই ছিল, এটা বলা যায়। যেমনÑছয় দফার ওপর যদি আমরা একটু চোখ বুলিয়ে নিই, তাহলে এগুলোতে কী আছে দেখা যাকÑ

প্রথম দফা : সরকারের বৈশিষ্ট হবে ঋবফবৎধষ বা যৌথরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যৌথরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে।

দ্বিতীয় দফা : কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয় এবং তৃতীয় দফায় ব্যবস্থিত শর্তসাপেক্ষ বিষয়।

তৃতীয় দফা : পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময় করা চলবে। অথবা এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রাব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে।

চতুর্থ দফা : রাজস্ব ধার্য ও আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ের ব্যয় নির্বাহের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় রাজস্বের জোগান দেওয়া হবে। সংবিধানে নির্দেশিত বিধানের বলে রাজস্বের এই নির্ধারিত অংশ স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে জমা হয়ে যাবে। এহেন সাংবিধানিক বিধানে এমন নিশ্চয়তা থাকবে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের প্রয়োজন মেটানোর ব্যাপারটি এমন একটি লক্ষ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে, যেন রাজস্বনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে থাকে।

পঞ্চম দফা : যৌথ রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, সেই অঙ্গরাজ্যের সরকার যাতে স্বীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে তার পৃথক হিসাব রাখতে পারে, সংবিধানে সেরূপ বিধান থাকতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে, সংবিধান নির্দেশিত বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত অনুপাতের ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে তা আদায় করা হবে। সংবিধান নির্দেশিত বিধানানুযায়ী দেশের বৈদেশিক নীতির কাঠামোর মধ্যে, যার দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য সম্পর্কে চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে থাকবে।

ষষ্ঠ দফা : ফলপ্রসূভাবে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে সাহায্যের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোকে মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।

৪.

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি হওয়ার পরই এর নেতারা এমন কর্মকা- শুরু করল যে-কারোর বুঝে নিতে বাকি থাকল না যে, দুটি অংশ নিয়ে রাষ্ট্রটি গঠন হয়েছে তার একটি অংশ টিকবে না। ক্রমেই তা স্বাধীনতার দিকেই ধাবিত হবে। তার একটি লক্ষণ দেখা গেল বাংলা ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত দেখে। বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে সেখানে উর্দু ভাষা বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। এতে বাঙালি বসে থাকেনি। গর্জে উঠেছে। বাংলা ভাষার জন্য সালাম, রফিক, বরকত প্রমুখ শহীদ হয়েছেন। তখনই অনেকে বুঝে গেলেনÑএভাবে বাঙালিদের দমিয়ে রাখা যাবে না। তার চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানিদের হারিয়ে চরমভাবে পরাজিত করে বিশ্বের বুকে অভ্যুদয় ঘটল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।

"