ভাটি বাংলার গান

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

মাহবুবুল আলম

নদী মাতৃক এ দেশের মানুষের জীবন নদীর জীবনের সঙ্গে একই সূত্রে গাথা। আর নদী ঘিরে রয়েছে প্রাণ-অফুরান ভাটিয়ালির সুর। যে সুর বাঙালির প্রাণের গভীর থেকে উৎসারিত এক অনুষঙ্গ। জীবন পরিণতির পথে এমনি প্রবহমান, যে মুহূর্ত সে অতিক্রম করে সেটি আর ফিরে আসে না। বাংলার ভাটিয়ালি গানের কবি তাই বলেন, ‘তরী ভাট্যায় পথ আর উজান না।’ অথবা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মাঝি যখন আনমনে গেয়ে ওঠেন, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে/আমি আর বাইতে পারলাম না’। এ যেন মানুষের প্রাণের গভীর থেকে প্রকাশিত এক অনন্য আকুতি।

ভাটিয়ালি বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের জনপ্রিয় গান। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর-বাঁওড়বেষ্টিত এক বিশাল ভূখ-ে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বেশকটি উপজেলা এ জনপদের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলোতেই ভাটিয়ালি মূল সৃষ্টি, চর্চাস্থল এবং সেখানে এ গানের ব্যাপক প্রভাব। বাউলদের মতে, ভাটিয়ালি গান হলো তাদের প্রকৃতি প্রদত্ত ভবের গান। ভাটিয়ালি গানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এ গানগুলো রচিত হয় মূলত মাঝি, নৌকা, দাড়, গুন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। সঙ্গে যুক্ত থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নারী-পুরুষের প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা, বিরহ, আকুলতা ইত্যাদির আবেগ গাথা।

তাহলে ভাটিয়ালি গান বলতে আমরা কি বুঝি; ভাটিয়ালি গান হলো লোকসংগীতের এমন একটি শাখা, যা বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের মানুষ গেয়ে থাকেন। এই গান বাংলাদেশের সব অঞ্চলে গীত হলেও বিশেষ করে নদ-নদী পূর্ণ ময়মনসিংহ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর-পূর্ব দিকের অঞ্চলগুলোতেই ভাটিয়ালি গানের মূল সৃষ্টিস্থল, চর্চাস্থল এবং সেখানে এ গানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চল বলতে নদ-নদী বিধৌত নিম্নাঞ্চল বোঝায়। নদী-স্রোতের অভিমুখে উজান-ভাটি শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের নদীগুলোর জলপ্রবাহের গতিপথ উত্তর থেকে দক্ষিণ বরাবর। কোনো কোনো নদী পূর্ব-পশ্চিমে বাঁক খেলেও চূড়ান্ত লক্ষ্য দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর। এই হিসেবে যেকোনো নদীর ¯্রােত-উৎসের দিককে বলা হয় উজান এবং স্রোতের অধমুখের দিক হয় ভাটি অঞ্চল। পূর্ববাংলার ভাটি অঞ্চল প্রধান তিনটি অংশে বিভাজিত। যেমন-উত্তর-পূর্ব ভাটি অঞ্চল : পূর্ববাংলার উত্তর-সীমান্তের গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ক্রমঢালু অঞ্চল। এই অঞ্চলের পুরনো ও নতুন ব্রহ্মপুত্র এবং এর শাখা নদীসমূহের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাটি অঞ্চল। মধ্য-পূর্ব ভাটি অঞ্চল : বহ্মপুত্র, পদ্মা এবং এদের শাখা নদীর দ্বারা সৃষ্ট ঢাকা এবং সৃষ্ট হাত্তর ফরিদপুরের ভাটি অঞ্চল। পূর্ব ভাটি অঞ্চল : সুরমা, কুশিয়ারা, পদ্মা, মেঘনা এবং এদের দ্বারা সৃষ্ট ঢাকার পূর্বাঞ্চল, কুমিল্লা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল।

ভাটিয়ালি গানের মূল বৈশিষ্ট্য হলো মাঝি, নৌকা, দাড়, গুন ইত্যাদি বিষয়ের সঙ্গে থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নারীর প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা, বিরহ, আকুলতা ইত্যাদির সম্মিলন। যেমন “আষাঢ় মাসে ভাসা পানি/পূবালি বাতাসে/বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি,/আমার নি কেউ আসেরে”। বা “নাও বাইয়া যাও ভাটিয়ালি নাইয়া/ভাটিয়ালি নদী দিয়া/আমার বন্ধুর খবর কইয়ো/আমি যাইতেছি মরিয়া।”

এ গানে বাংলার মানুষের, নদী মাতৃক দেশের মানুষের প্রাণের আবেগ বা বাণীই ধরা পড়ে। বাংলাদেশের লোককবির কণ্ঠেই আমরা তাই শুনি : “কূলে কূলে ঘুরিয়া বেড়াই আমি/ পাই না ঘাটের ঠিকানা ডুব দিলাম না”। অথবা আবদুল আলীমের “নাইয়ারে নায়ে বাদাম তুইল্যা কোন দূরে

যাও চইল্যা।”

এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভাটিয়ালি গানে ‘নদীর ভাটির টান’ এবং ‘ভাটি অঞ্চল’ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ভাটি অঞ্চলের মাঝি-মাল্লারাই এ গানের ধারক ও বাহক। বিষয় ও সুরের বিচিত্রতা তেমন না থাকলেও গানগুলোতে ভাবের গভীরতা ও সুরের মাধুর্য ছিল ব্যাপক। প্রায় প্রতিটি গানের সুর করুণ, উদাসীন ও বিবাগী। যদিও একক কণ্ঠের গান, তবু তা মনকে দারুণভাবে আলোরিত ও আন্দোলিত করে, সৃষ্টি করে মধুরতম এক আবেদন। ভাটিয়ালি শোনামাত্রই হৃদয় সরোবরে বয়ে চলে

ভাবের তুফান।

ভাটিয়ালি বাংলা লোকগানের প্রধান চারটি ধারার একটি। মাঝিদের গানের সূত্রে যদি ভাটিয়ালি গানের উদ্ভব হয়, তাহলে তার উৎপত্তি ঘটেছে দূরগামী বজরা বা গহনা জাতীয় নৌকার মাঝিমাল্লার গান। এরা এসব নৌযান নিয়ে দীর্ঘপথ অতিক্রম করত। ঘর-ছাড়া এসব মাঝি নদীতে নদীতে ভেসে বেড়াতেন। চলমান নৌযানে অনেক সময়ই মাঝিদের হাল ধরে বসে থাকা ছাড়া কাজ থাকত না। সে সময় নদীর মনোরম খোলা হাওয়া নৌকার পালের সঙ্গে সঙ্গে মনের পালেও হাওয়া লাগিয়ে গান গাইতেন। এসব গানে থাকত বসতবাড়ির কথা, স্ত্রী-সন্তান, পিতা-মাতার কথা। গানে বাঁধা পড়ত নানা ধরনের সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা।

আমরা জানি, ভাটিয়ালি কাব্য বা ছন্দের নাম নয়। এটি সুরের নাম। এই সুরের মায়া শুধু মাঝিদের ভেতরেই থাকেনি। কালে কালে ভাটি অঞ্চলের স্থলচর সাধারণ মানুষের গানেও ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ অঞ্চলের মাঠের রাখাল বালক, সাধারণ গৃহিণী কৃষক বা অন্য পেশাজীবীরা ভাটিয়ালির সুরে আকৃষ্ট হয়েছেন। তাই এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাউল, মুর্শিদী, মারফতি ইত্যাদি গানেও। এই গানের সুর প্রবহমান নদীর মতোও গতিময়। কিন্তু চাঞ্চল্য নেই। আছে সুরের গভীর প্রবাহ। ভাটিয়ালি গানে পাওয়া যায় অতল জলের আহ্বান। অনেকে ভারতীয় রাগের সন্ধান করেছেন এই গানের সুরে। বাস্তবে কোনো কোনো ভাটিয়ালি সুরের

সঙ্গে কোনো বিশেষ রাগের রূপ মিলে যেতে পারে। কিন্তু ভাটিয়ালি গানের সুরকাররা

রাগের চেয়ে মনের অনুরাগকে মর্যাদা

দিয়েছেন বেশি।

একথা বললে অত্যুক্তি হবে না, ভাটিয়ালি গানের একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে নর-নারীর প্রেম। বিশেষ করে নারী মনের জাগতিক ভাবনার বিষয়-আশয়। এ গানে রয়েছে যেমন মাঝিদের দীর্ঘ জলযাত্রার স্ত্রী-বিরহ, পাশাপাশি রয়েছে প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদে থাকার বেদনা কিংবা বন্দরে বন্দরে ঘুরতে ঘুরতে কোনো নারীর প্রেমে পড়ে যাওয়ার আনন্দ। কিংবা নদী পারের কোনো সুন্দরীকে দেখে মোহাবিষ্টের গান। কলসি কাঁখে কোনো কিশোরীকে দেখে মাঝি ক্ষণিক মোহে গানে বেঁধেছেন- ‘আরে ও কলসি কাঁখের নারী/সোনার যৌবন হাইল্যা পড়ে বদন ভিজা শাড়ি/একা কেন আইলা ঘাটে নবীন কিশোরী/যদি কোনো সওদাগরে

তোমায় করে চুরি।’

যাই হোক আমরা যারা সাহিত্যচর্চা করি, তারা সবাই কম-বেশি জানি, ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের অবসান হয়। এরপর থেকে পূর্ব-মধ্য-দক্ষিণ বাংলায় মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটে। একই সঙ্গে পূর্ব বাংলার আদি লোকসংগীতে ভাটিয়ালি সুরের গানের বিকাশ ঘটতে থাকে। প্রাথমিক স্তরে প্রেম-বিরহে ভাটিয়ালি গানের বিকাশ ঘটলেও ধীরে ধীরে এর সঙ্গে বাউল দর্শন, আধ্যাত্মিক ভক্তিরসের গান যুক্ত হতে থাকে। এধারায় বিষয়ভিত্তিক গানের ভিন্নতর গানের সৃষ্টি হয়। যেমন-‘নাওরে শূন্যের ভরে উড়াল দিয়া যাও’ অথবা ‘বাঁশি বাজে বাজে রইয়া রইয়া/গৃহে যাইতে মন চলে না প্রাণ বন্ধুরে থইয়া’-

ভাটিয়ালি গান মানেই ভাটির প্রকৃতি, প্রেম-

বিরহ ও ভাটিবাসীর দুঃখ-বেদনা এবং হতাশা-নৈরাশ্যের প্রতিচ্ছবি। রচনার দিক দিয়ে

নিতান্ত সরল এবং সংক্ষিপ্ত হলেও দূরের নদী বা হাওর থেকে ভেসে আসা এ

গানের সুর মনকে ব্যাকুল করে তুলে। হাওর-

নদীর বাতাস ও ঢেউয়ের সঙ্গে মনের গহিন কোণের আবেগ মিশে গিয়ে এক

অন্যরকম ভাবাবেগের সৃষ্টি করে। একদিকে লৌকিক প্রেম, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক চেতনা-এর দুই-ই প্রতিফলিত হয়ে আসছে ভাটিয়ালি গানে। ভাটিতে বিয়ে দেওয়া উজানের মেয়ে সারা বছর অপেক্ষায় থাকে কখন বর্ষা আসবে, কখন নাইওর যাবে বাবাবাড়িতে। কারণ হেমন্তকালে দিগন্ত জোড়া পথ হেঁটে বাবাবাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয় না কুলবধূর। দীর্ঘ সময় ধরে মা-বাবার আদর-সোহাগ বঞ্চিত ভাটির বধূর এই অপেক্ষার দিনগুলোকে ভাটিয়ালির ¯্রষ্টারা তুলে এনেছেন তাদের গানের কথা ও বাণীতে।

আবার ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে বা গন্তব্যে পৌঁছতে মাঝিমাল্লাদের যখন গৃহ-সংসার ছেড়ে হাওর বা নদীবক্ষে কেটেছে দিনের পর দিন; তখনই উদ্ভব হয়েছে এ ধরনের গান। ভাটিয়ালিতে হতাশা, বৈরাগ্য বা বিরহ-বিচ্ছেদের সুর প্রতিফলিত হলেও সারিগান তাদের এনে দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য, কর্মোৎসাহ। তাই একই নৌকায় বা ছইয়ের ওপর বসে কর্মজীবীরা ভাটিয়ালির সুরে যেমন ডুবেছেন বা মজেছেন, পরক্ষণে আবার কর্মস্পৃহা ফিরে পেতে সমবেত কণ্ঠে সারিগানও গেয়েছেন তারা। ভাটিয়ালির মতো সারিগানও শুধু নৌকার ছইয়ের ওপর সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধান-পাটের খেত নিড়ানো, ছাদ পেটানো প্রভৃতি কাজেও শ্রমিক শ্রেণির লোকজন কর্মোদ্দমের তাগিদে সারিগান গাইতেন। এ রকমই একটি গান হলো-‘হিজল কাঠের নৌকাখানি পাতলা পাতলা গুঁড়া/বাইচের চুটে দৌড়ের নাও শূন্যে দিবে উড়া/নাওরে শূন্যের ভরে উড়াল দিয়া যাও’।

কিন্তু কালের বিবর্তনের ধারায় হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত ঐতিহ্যের ভাটিয়ালি গান। যান্ত্রিকতা গ্রাস করেছে গ্রামের শান্ত-সুনিবিড় নদ-নদীর রূপ-বৈচিত্র্যকেও। কিন্তু তাই বলে ভাটিয়ালি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি আজও।

"