চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচ

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

ভ্র মণ করতে কার না ভালো লাগে। সেটা দেশ হোক কিংবা বিদেশ-ভ্রমণের আনন্দই আলাদা। তাই যখনই সুযোগ আসে মন অস্থির হয়ে ওঠে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে। যদিও বেশ কয়েকবার আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়ার কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, পাঞ্জাব বলা যায় একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের অনেক দর্শনীয় স্থানই ভ্রমণ করেছি, কিন্তু চেন্নায়ের মেরিনা বিচের সৌন্দর্য উপভোগ না করায় ভালো লাগছিল না। কিছুদিন আগে সিদ্ধান্ত হয় আমাদের একমাত্র কন্যা সপ্তর্ষীকে ডাক্তার দেখানোর জন্য ভেলোরের সিএমসি হাসপাতালে যাওয়ার। সে উদ্দেশ্যে আমি, আমার মিসেস ফারহানা হোসেন ও আমাদের কন্যা সপ্তর্ষী মিলে নির্ধারিত তারিখে কলকাতা পৌঁছি। যারা ইন্ডিয়া গিয়েছেন তারা হয়তো জানেন ট্রেনের টিকিট পাওয়াটা যেন সোনার হরিণ। কলকাতা-চেন্নাই ট্রেন লাইনের দূরত্ব ১ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার। দুই-তিন মাস আগেই টিকিট শেষ হয়ে যায়। তবে নামে কিছু টিকিট ছাড়া হয় যাত্রার ২৪ ঘণ্টা আগে। কাউন্টারে টিকিট পাওয়া না গেলেও পরিবহন এজেন্টরা তা বিক্রি করেন। যাত্রীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় ধনী-দরিদ্র সব যাত্রীর ভ্রমণযোগ্য সাশ্রয়ী মূল্যের টিকিট রয়েছে। অবস্থাবানদের ভ্রমণে ২ হাজার ৯০০ রুপি মূল্যের টু টেয়ার এসি টিকিট যেমন রয়েছে; তেমনি মাত্র ৪২০ রুপি দিয়েও রিজার্ভেশন টিকিট পাওয়া যায়। রিজার্ভেশন মানে ঘুমানো সিট। ভারত সরকার অন্তত মানুষের পকেটের কথা চিন্তা করেছে। তবে ট্রেনে ভ্রমণ বেশ আরামদায়ক। টিকিটের বিষয়ে আমাদের কোনো সমস্যা হয়নি, কেননা আগেই এক বন্ধু টিকিট কেটে রেখেছিলেন বলে কোনো ঝামেলা ছাড়াই কলকাতার হাওড়া রেলস্টেশন থেকে ভেলোরের উদ্দেশে যাত্রা করি।

বিশাল দেশ ইন্ডিয়া। দেশটিতে মরুভূমি থেকে শুরু করে পাহাড়-ঝরনা কী নেই? দ্রুতগতির ট্রেন আঁকাবাঁকা পথে চলছে তো চলছেই। মাঝে মাঝে দম নেওয়ার মতো স্টেশনে একটু দাঁড়ানো। কখনো বিশাল নদীর ওপর দিয়ে, কখনো পাথরের পাহাড় চিরে, কখনো শস্য-শ্যামলীমা দর্শনে পান্থজনের প্রাণজুড়ে যায়। বড় বড় পাহাড় আর মরুভূমি পেরিয়ে আমরা যথাসময়ে ভেলোরের কাটপাডি রেলস্টেশনে পৌঁছে যাই। সেখান থেকে প্রথমে থাকার জন্য সিএমসি হাসপাতালের পাশেই আবাসিক হোটেল ঠিক করি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সিএমসি হাপাতালে যাই। প্রায় ৩২-৩৩ ঘণ্টা সময় লেগে যায় কলকাতা থেকে ভেলোর পেঁৗঁছতে। সপ্তর্ষীর চিকিৎসায় বেশ কিছুদিন সময় লেগে যায়, সারাক্ষণই মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয়েছে। কোথাও যে ঘুরতে যাব তার সময় বের করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশে আসার আগে কিছুটা সময় পাওয়া গেল। আবাসিক হোটেলে কয়েক দিন থাকায় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়। তাদের মাঝে কলকাতা থেকে চিকিৎসার জন্য এসেছেন সুমন ও মুন্না নামে দুই যুবক। এক দিন তারা বললেন, দাদা! চলুন সবাই মিলে মেরিনা বিচ থেকে ঘুরে আসি।

এদিকে আমরাও যেহেতু চেন্নাই যাওয়ার সময় বের করছিলাম, তাই সবাই মিলে সময় নির্ধারণ করে ভেলোরের কাটপাডি থেকে ভোরে চেন্নাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা করি। ২ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা চেন্নাইয়ের বৃহত্তম রেলস্টেশন চেন্নাই সেন্ট্রালে পেঁৗঁছে যাই। স্টেশন থেকে ট্যাক্সিক্যাবে ১৫-২০ মিনিটেই মেরিনা বিচ। সেখানে আমাদের মতো হাজারো ভ্রমণপ্রেমী মানুষের মেলা। আসলে অনেকে এমন আছেন, যারা ঘোরার কথা শুনলে সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না। তাদের কাছে সমুদ্র মানেই অন্যরকম আনন্দ। মেরিনা বিচের বিশালতা দেখে সব সমুদ্রপ্রেমী মুগ্ধ হওয়ার কথা। ভারত মহাসাগরের বুক চিরে যেন শীতল পরশ নিয়ে জেগে আছে মেরিনা বিচ। মানচিত্রে চেন্নাই শহর এই উপমহাদেশের সর্ব দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের বুকের ওপর অবস্থিত। মেরিনা বিচ শহরের এক প্রান্তে। বিচ থেকে উত্তরে তাকালে মনে হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেখা যায়। মাঝে আর কিছু নেই। চিকচিক বালুকাময় সমুদ্র পাড়কে বেশ সুন্দর লাগছিল। সমুদ্রের ঢেউ দেখে নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না, লাফ দিয়ে নেমে পড়লাম।

তামিলনাড়– রাজ্যের রাজধানী এবং দেশের চতুর্থ বৃহত্তম মেট্রোপলিটান শহর হলো চেন্নাই। শিল্প ও বাণিজ্যের একটি বড় কেন্দ্র এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মন্দির স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত এই শহর। চেন্নাই ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে, তামিলনাড়– রাজ্যের উত্তর-পূর্ব কোনায় ১৩.০৫ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮০.১৮ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। শহরটি পূর্বাঞ্চলীয় সমভূমি নামক একটি সমতল উপকূলীয় সমভূমির ওপর অবস্থিত। সমুদ্রতল থেকে শহরটির গড়পড়তা উচ্চতা ৬ মিটার (২০ ফুট) এবং এর উচ্চতম বিন্দু সমুদ্রতল থেকে ৬০ মিটার (২০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত। চেন্নাইয়ের ভেতর দিয়ে দুটি নদী সর্পিলাকারে প্রবাহিত মধ্যাঞ্চলীয় কুয়ম নদী এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় আদিয়ার নদী। দুটি নদীই গার্হস্থ্য ও শিল্পজাত বর্জ্যরে কারণে দূষণের শিকার। আদিয়ার নদীটি কুয়ম নদীর তুলনায় কম দূষিত; স্থানীয় সরকার নিয়মিতভাবে এ নদীর তলদেশে সঞ্চিত পলি অপসারণ করে ও নদীটিকে শোধন করে। আদিয়ারের একটি সংরক্ষিত মোহনা প্রচুর পশুপাখির প্রাকৃতিক আবাসস্থল। চেন্নাইয়ের পুরনো নাম মাদ্রাজ। এর উৎপত্তি মাদ্রাজপত্তনম থেকে। ১৬৩৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি স্থায়ী উপনিবেশ স্থাপনের জন্য মাদ্রাজপত্তনমকে নির্বাচন করে। চেন্নাপত্তনম নামে একটি গ্রাম এর দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। পরবর্তীকালে এই দুই শহর একত্রিত করা হয় এবং ব্রিটিশদের পছন্দের কারণে মাদ্রাজ নামে পরিচিত হয়। তবে স্থানীয় লোকজন শহরটিকে চেন্নাপত্তনম বা চেন্নাপুরি হিসেবে উল্লেখ করতেন। ১৯৯৬ সালের আগস্টে এই শহরের নাম মাদ্রাজ থেকে পরিবর্তন করে চেন্নাই করা হয়, কারণ মাদ্রাজ শব্দটিকে পর্তুগিজ শব্দ মনে করা হতো। ইতিহাস যাই হোক, আমরা বেশ কিছুক্ষণ চেন্নাইয়ের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ভালো সময় অতিবাহিত করেছি। এ ছাড়া আমার মিসেস ও কন্যা বিচে বেশ আনন্দ উপভোগ করতে দেখে আমারও মন ভরে গিয়েছিল। সমুদ্রের বিশাল ঢেউ এলেই উপভোগ্য।

এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে অবশ্যই চিন্তামুক্ত করে দেবে। আমরা চেন্নাইয়ের আরো কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে আবার ট্রেনে করে ভেলোর ফিরে আসি।

বিমান যোগাযোগ : চেন্নাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের আকাশ ভ্রমণের জন্য বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার প্রধান কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রায় ত্রিশটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার ফ্লাইটের মাধ্যমে সরাসরি সংযুক্ত। এই বিমানবন্দরটি ভারতের দ্বিতীয় ব্যস্ততম মালবাহী টার্মিনাল।

রেল যোগাযোগ : শহরটিতে দুটি প্রধান রেল টার্মিনাল রয়েছে। শহরের বৃহত্তম রেলস্টেশন চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশন ভারতের সব প্রধান নগরী এবং শহরের সঙ্গে এবং অপর রেলস্টেশন চেন্নাই এগমোর তামিলনাড়–র অন্তর্বর্তী গন্তব্যের জন্য ট্রেন সংযোগ রক্ষা করে। মূলত বাস এবং ট্রেন হলো শহরের জনপ্রিয় পরিবহন মাধ্যম।

"