নজরুলের চেতনা রুখবে জঙ্গিবাদ

প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৭, ০০:০০

নিতাই চন্দ্র রায়

জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও ভয়াবহ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শ ও চেতনায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব। এই কথাটিই সদ্য সমাপ্ত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠে বার বার উচ্চারিত হয়েছে।

সম্প্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান। সমাবর্তন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে চ্যান্সেলর মহোদয় ডিগ্রিপ্রাপ্তদের আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাসনদ প্রদান করেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন এবং সভাপতিত্ব করেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ইমেরিটাস প্রফেসর ও বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে বলেন, ‘পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ এখনো কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। তাই আমাদের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৪টি। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে। ওই সময় দেশে কোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব ছিল না। বর্তমানে দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬টি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির মতে, বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষার গুণগত মানকে ব্যাহত করে। অনেক ক্ষেত্রে মেধা বিকাশের পথকেও বাধাগ্রস্ত করে। সার্টিফিকেট একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি হলেও শিক্ষার মূল লক্ষ্য হতে পারে না। ১৯৯৬ সাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংস্কৃতিক ফোরাম ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আন্দোলন করে আসছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদে ত্রিশালে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের নামে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আইন পাস করা হয়। সেই থেকে একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কর্মকা- পরিচালনা করে আসছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের শিল্পী-সাহিত্যিক-গবষেকরা চান, ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি ভারতের বিশ্বভারতীর মতো একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে উঠুক। এখানকার অধ্যয়নের পদ্ধতিও হোক আলাদা ধরনের। এখানে সাহিত্য, সঙ্গীত, চারুকলা, নন্দনতত্ত্ব, বিশ্বসাহিত্য, সাংবাদিকতা প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা হোক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশে আসুক। নজরুলসাহিত্যের ওপর পড়াশোনা ও গবেষণা করুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতির সামনে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ও শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ গঠনের অঙ্গীকারকে তুলে ধরুক। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারত থেকে এনে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুই অসুস্থ কবিকে পিজি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে সঙ্গে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বঙ্গবন্ধু তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় প্রায়ই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কবিতাংশ উচ্চারণ করতেন। মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতেন। বাঙালির প্রতিটি আন্দোলনে নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান জুগিয়েছে সীমাহীন প্রেরণা। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের জন্য নজরুল ইসলাম বহুবার কারাবরণ করেন। কারগারের ভেতরেও তিনি গেয়ে ওঠেন, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট,/ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট, রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।’ নজরুলের গান ও কবিতা স্বাধীনতাকামী সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে উজ্জীবিত করেছে ভীষণভাবে। ‘চল্ চল্ চল্। ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,/নি¤েœ উতলা ধরণী-তল,/অরুণ প্রাতের তরুণ-দল/চলরে চলরে চল্/চল্ চল্ চল্।’ গানটি ছিল আমাদের রণসঙ্গীত। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা এই গানে দারুণভাবে আন্দোলিত হতেন। ২০০৬ সালে সঙ্গীত, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং- এই ৪টি অনুষদের সীমিত সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে যাত্রা শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ৪টি অনুষদের ১৯টি বিভাগে পাঁচ সহ¯্রাধিক ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করছে।

ভারতের আসানসোলে প্রতিষ্ঠিত কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নজরুলের সাহিত্য ও গবেষণা সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান ও ভাব বিনিময় হবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. সাধন চক্রবর্তী গত বছর ১১৭তম নজরুলজয়ন্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে দুই বাংলায় সম্মিলিতভাবে নজরুলচর্চার ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা এবং শিক্ষা বিনিময়ের আশাবাদ ব্যক্ত করে গেছেন। এরই ধাররাবাহিকতায় এ বছরও দুই দেশের দুইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক মানের সেমিনারের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ। এই সেমিনারে দুই বাংলার নজরুলপ্রেমী ও গবেষকরা অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ভবন, হল, মঞ্চ ও ক্যান্টিনসহ সব স্থাপনা কবি নজরুলের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের নামে নামকরণ করা হয়েছে, যার দৃষ্টান্ত অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় না।

একদিন ইংরেজ কবি শেক্সপিয়ার এবং কবি হাফিজের জন্মভূমির মতো ত্রিশাল নজরুলের তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। নজরুলকে জানার জন্য তার সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা ত্রিশালে আসবেন। তারা নজরুলের সাহিত্যকর্মের ওপর গবেষণা করবেন। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনা সারা বিশ্বের নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। যতদিন পৃথিবীতে শোষণ-নিপীড়ন-নির্যাতন থাকবে, ততদিন মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হবে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কবিতা ও গান। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় ত্রিশালে অতিবাহিত করেন। ১৯১৪ সালে রফিজ উল্লাহ দারোগা কিশোর নজরুলকে আসানসোলের একটি রুটির দোকান থেকে নিজ বাড়ি কাজীরশিমলায় নিয়ে আসেন এবং দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করেন। কাজীরশিমলা থেকে দরিরামপুরের দূরত্ব ছিল ১০ কিলোমিটার। এতদূর থেকে প্রতিদিন কিশোর নজরুলের পক্ষে বিদ্যালয়ে আসা কষ্টকর ছিল। তাই নামাত্রিশালের বেচুতিয়া ব্যাপারীবাড়িতে নজরুলের জায়গিরের ব্যবস্থা করা হয়। বেচুতিয়া ব্যাপারীবাড়ির অদূরেই ছিল শুকনি বিল। সেই বিলের ধারে একটি বটবৃক্ষের নিচে বসে কবি রাখালবালকদের সঙ্গে সুর করে গান গাইতেন এবং বাঁশি বাজাতেন। নজরুলের শৈশবের সেই স্মৃতিকে ঘিরেই ত্রিশালে স্থাপন করা হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতি বছর ১১ থেকে ১৩ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত তিন দিন মহাধুমধামের সঙ্গে ত্রিশালে নজরুলজয়ন্তী উদযাপিত হয়। নজরুলজয়ন্তীতে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দেশের প্রথিতযশা শিল্পীরা নজরুলের নাটক, কবিতা ও গান পরিবেশন করেন। একজন কবির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম পৃথিবীর কোথাও হয় বলে আমাদের জানা নেই।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে এ দেশের মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এক কোটি শরণার্থী একই তাঁবুর নিচে ৯ মাস বসবাস করেছে। তখন ধর্মের নামে কোনো বিভেদ ছিল না। মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধের সম্মিলিত রক্ত¯্রােত একসঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে বাংলার বারশ’ নদী ও বঙ্গোপসাগরে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের দেশাত্মবোধক গান জাগিয়েছে সীমাহীন প্রেরণা। তার চিরসংগ্রামী গানগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ করেছে এক নতুন মাত্রা এবং অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে অনুরণন তুলেছে শিল্পীদের কণ্ঠে। নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি, জাগরণের কবি। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরাও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হানাদার পাকসেনাদের বিরুদ্ধে জীবনপণ যুদ্ধ ঘোষণা করে। নজরুলের চিরজীবী গান নতুন করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করে। সাম্যের কবি, বিদ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের চেতনার পথ ধরেই ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে নেতৃত্বে হাজার বছরের পরাধীন বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে।

কবি চিরকাল সত্য ও সুন্দরের গান গেয়েছেন। প্রাণের মধ্যে যে সত্য, তার চেয়ে বড় সত্য আর নেই। সেই সত্যকেই দেখেছেন তিনি সবার ওপরে। নজরুলের কাছে মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। তিনি ছিলেন বিশ্ব মানবতার কবি- ‘গাহি সাম্যের গান-/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে ধর্মের নামে মানুষ হন্তা যে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, তা শুধু শক্তি প্রয়োগ করে অস্ত্রের মাধ্যমে দমন করা সম্ভব হবে না। নতুন

প্রজন্মের কাছে নজরুলের কবিতা, গান, উপন্যাস ও প্রবন্ধগুলোর ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে তার অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও চেতনাকে তুলে ধরতে হবে এবং এই কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো যুবক জঙ্গি হতে পারে না, ধর্মের নামে মানুষ খুন করতে পারে না। তাই নতুন প্রজন্মকে নজরুলচর্চায় আরো বেশি উৎসাহিত করতে হবে। নতুন প্রজন্ম গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নজরুলের চেতনায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। বিশ্বকে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

"