‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’

একটি কবিতা অমর গানে রূপান্তর

প্রকাশ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

ড. রফিকুল ইসলাম

১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, কার্জন হল, নবাবপুর, বংশাল, জনসন রোড এলাকায়, বাংলা ভাষার দাবি জানানোর অপরাধে বাঙালি ছাত্রজনতার ওপর পুলিশ, ইপিআর ও মিলিটারির লাঠি, টিয়ার গ্যাস, বেয়োনেট চার্জ ও নির্বিচার গুলিবর্ষণে কতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন তার সঠিক সংখ্যা জানার কোনো উপায় নেই। নূরুল আমীনের মুসলিম লীগ সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের মধ্যে নিহতদের অনেকের বিশেষতঃ কিশোরদের লাশ গুম করে ফেলেছিল। সে জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হলেও মাত্র দুজন ভাষাশহীদের লাশ আজিমপুর গোরস্তানে রয়েছে, যাদের একজন আবুল বরকত, অপরজন শফিউর রহমান। ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল পুলিশের বুলেটে; রফিকউদ্দিনের বুলেটে উড়ে যাওয়া মাথার ছবি (আমানুল কর্তৃক গৃহীত) রয়েছে, কিন্তু তার কবর নেই। ভাষাশহীদ সালাম, জব্বার, আউয়ালের কবর নেই। মুসলিম লীগ সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, সঙ্গে সঙ্গে লাশ নিয়ে গেছে, হাসপাতাল থেকে লাশ গুম করেছে।

অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীরা ভাষা শহীদানের স্মৃতি অমর করে রাখার জন্য ২২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় পুরোনো কলাভবন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সলিমউল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক, মুসলিম হল প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাসে কালো পতাকা উত্তোলন করেছে, কালো ব্যাজ পরিধান করেছে, শহীদানের রক্তাক্ত জামা-কাপড়কে রক্ত পতাকা বানিয়ে শোক শোভাযাত্রা করেছে, গায়েবানা জানাজা পড়েছে। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতারাতি কারফিউর মধ্যে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল (বর্তমানে যেখানে মেডিক্যাল কলেজ ডিসপেনসারি, শহীদ মিনার, নাসেস হোস্টেল, মেডিক্যাল সুপারের বাসা) প্রাঙ্গণে দশ ফুটেরও উঁচু একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে, যা হয়ে উঠেছিল ১৯৫২ সালের ২৪, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বস্তরের বাঙালি নরনারী ও শিশুর তীর্থস্থান, কিন্তু ২৬ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণে নূরুল আমীনের পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল বাঙালির প্রথম শহীদ মিনার। যে শহীদ মিনার নিয়ে তরুণ কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছিলেন, ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমারা এখনো চার কোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো। যে ভিত কখনো কোনো রাজন্য পারেনি ভাঙতে...’। ভাষা শহীদানের আত্মদানের সংবাদ চট্টগ্রামে পৌঁছানো মাত্র ‘সীমান্ত’ সম্পাদক মাহবুব উল আলম চৌধুরী তাৎক্ষণিকভাবে লিখেছিলেন ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ একুশের প্রথম কবিতা, খুলনায় রচিত হয়েছিল একুশের প্রথম গান ‘মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচানোর তরে’। রচয়িতা মশাররফ উদ্দিন আহমদ, সুরকার আলতাফ মাহমুদ। ঢাকায় ভাষা শহীদদের নাম নিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান লিখলেন ‘অমর একুশে’ কবিতায় ‘আবুল বরকত নেই, সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বিশাল শরীর ঝলক... সালাম রফিকউদ্দিন, সারি নাম বর্শার তীক্ষè ফণার মতো এখন হৃদয়কে হানে।’

১৯৫২ সাল শেষ হয়ে আসে ভাষা শহীদের স্মৃতিতর্পণ, স্মৃতিচারণা আর ভাষা শহীদানের রক্তাক্ত স্মৃতি নিয়ে। ১৯৫২ সাল, শীতের সন্ধ্যায় কুয়াশাচ্ছন্ন, গেÐারিয়ার ধূপখোলার মাঠে সেদিনের পূর্ব বাংলার প্রথম অসা¤প্রদায়িক প্রগতিশীল যুব সংগঠন যুবলীগের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে মুক্ত মঞ্চে। সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে। মঞ্চে আলো-আঁধারে গণশিল্পীদের কণ্ঠে গণংগীতের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ অন্ধকারে কে যেন হাতে গুঁজে দিল একটি লিফলেট জাতীয় কাগজ, ভাঁজ করে পকেটে রেখে দিলাম, বাড়ি এসে খুলে দেখলাম লিফলেটের ছাপা একটি দীর্ঘ কবিতা, কবির নাম নেই।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রæ-গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্ত রাঙানো ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।

 

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো

কালবৈশেখীরা

শিশু হত্যার বিক্ষোভ আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,

দেশের সোনার ছেলে খুন করে রেখো মানুষের দাবি

দিন বদলের ক্লান্তিলগনে তবু তোরা পার পাবি?

না, না, না, না, খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেয়া তারই

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

 

সেদিনে এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে

রাতজাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে,

পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেনো,

এমন সময় ঝড় এলো এক, ঝড় এলো ক্যাপা বুনো।

 

সেই আঁধারে পশুদের মুখ চেনা

তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভাইয়ের চরম ঘৃণা

ওরা গুলি ছোড়ে এ দেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে

ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এ বাংলার বুকে।

 

ওরা এ দেশের নয়,

দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়

ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, নিয়েছে কাড়ি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

 

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি

আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী

আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে

জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে

দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালাবো ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

 

কবিতাটি পাঠ করে শিহরিত হলাম, বারবার পাঠ করলাম। ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ সাক্ষী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র, একুশের অভ‚তপূর্ব ঘটনাবলির আলোকচিত্র শিল্পী আমি, দেখেছি বুলেটের আঘাতের চ‚র্ণবিচ‚র্ণ রক্তাক্ত রফিকউদ্দিন আহমদের লাশ, বুলেটবিদ্ধ আবুল বরকত ও আরো অগণিত ছাত্র জনতাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে গায়েবানা জানাজার পর বিশাল শোক মিছিলের ওপর যখন কার্জন হল ও পুরোনো হাইকোর্টের মাঝামাঝি রাজপথে নির্বিচারে গুলি চলে তখনো সেখানে ছিলাম। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রথম শহীদ মিনারে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখেছি, স্বাভাবিকভাবে কবিতাটি আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে; যতœ করে কবিতাটি তুলে রাখি মহামূল্যবান সম্পদরূপে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, কবিতাটির রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী বরিশালের ছেলে, বেচারাম দেউড়িতে অবস্থিত ঢাকা কলেজ হোস্টেলে থাকে, সাংবাদিকতা করে পড়াশোনা চালায়। তখনো তাকে আমি দেখিনি, তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, পুরোনো পল্টনে অবস্থিত ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে, ঢাকা কলেজের ছাত্রদের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে। আবদুল গাফফার চৌধুরী এ একটি রচনার জন্যই অমর হয়ে থাকবেন। দেখতে দেখতে ১৯৫২ সাল শেষ হয়ে এলো, এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কুমিল্লায় সাংস্কৃতিক সম্মেলন। কুমিল্লায় ‘প্রগতি মজলিস’-এর উদ্যোগে ২২, ২৩ ও ২৪ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, এটি ছিল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মিলনমেলা। মূল সভাপতি চট্টগ্রামের আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ বলেছিলেন, ‘আজ বোধ হয় তাহারা দেশকে পাপে ডুবাইতে চাহেন, যাহারা প্রশ্ন তুলিয়াছেন বাঙলা ভাষা আমাদের সংস্কৃতির বাহন হইতে পারে না।... সংস্কৃতি ধ্বংসের অনেক পথ আছে।

জনসাধারণ বিরোধী ও সমাজবিরোধী গোঁয়ারনীতি তার অন্যতম উপায় বটে। কিন্তু তার পরিণাম ফল পারস্যে আরবদের ভাগ্যের মতো হতে বাধ্য।

বলাবাহুল্য যে, সাহিত্য বিশারদের ওই ভবিষ্যদ্বাণী বিশ বছর পুরো হওয়ায় আগেই ফলেছিল। বাংলা ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ দিবস। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘শহীদ দিবস’ পালনের আয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম, ঠিক হলো শহীদ দিবস সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত ভবনে কালো পতাকা ওড়ানো হবে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবেই হোক ‘শহীদ মিনার’ তৈরি করা হবে, বের করা হবে কালো ব্যাজ পরিহিত ছাত্রছাত্রীদের নগ্নপদ শোভাযাত্রা এবং প্রভাতফেরি, আজিমপুর গোরস্তানে ভাষা শহীদ আবুল বরকত আর শফিউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক দেওয়া হবে। পুষ্পস্তবক দেওয়া হবে নূরুল আমীন সরকার কর্তৃক গুঁড়িয়ে দেওয়া মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রথম শহীদ মিনারের স্থানে কালো কাপড় দিয়ে ঘেরা প্রতীকী শহীদ মিনারে; সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে বিভিন্ন শিক্ষালয়ে। সমস্যা দেখা দিল শহীদ দিবসের গান নিয়ে, প্রভাতফেরির গান তখনকার মতো ঠিক হলো গাজীউল হকের লেখা ‘ভুলব না ভুলবনা একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি, সুর নেওয়া হলো একটি জনপ্রিয় প্রচলিত সিনেমার গান থেকে। ফজলুল হক হল থেকে ছাত্রদের প্রভাতফেরির একটি দল বের হলো, রাতে অন্যদের সঙ্গে বদরুল হাসান, তফাজ্জল হোসেন আর আমি তিনজন বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। মেয়েদের হোস্টেল থেকে রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী খালেদা ফ্যান্সী খানমের নেতৃত্বে ছাত্রীদের প্রভাতফেরির একটি দল বেরুলো। ঢাকা কলেজ তখন ছিল ফুলবাড়িয়া পুরোনো রেলস্টেশনের পেছনে সিদ্ধিজারে অবস্থিত ভাড়া করা কয়েকটি বাড়িতে। ইডেন কলেজের বিজ্ঞানের ছাত্রীরা ঢাকা কলেজের ল্যাবরেটরিতে প্র্যাকটিকেল ক্লাস করতে আসতো ঘোড়ার গাড়ি করে সকালের দিকে। ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্র যেমন আতিকুল ইসলাম, ইনাম আহমদ চৌধুরী, ইকবাল আনসারী খান ইডেন কলেজের ছাত্রী হালিমা খাতুনের সঙ্গে পরামর্শ করে স্থির করলো তারা মিলিতভাবে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে একটি শহীদ মিনার বানাবে আর সন্ধ্যায় পল্টনে অবস্থিত ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে শহীদ দিবস উপলক্ষে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবে। আমার মেজোভাই আতিকুল ইসলাম তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। সে আমাকে বললো, শহীদ দিবসের জন্য গান চাই। আমি গাজীউল হকের ‘ভুলব না ভুলব না একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানের কথা বললাম। আতিক বলল, ওই গানের সুর সিনেমার একটি গানের সুরে সুতরাং ওটা চলবে না, আমাদের শহীদ দিবসে আমাদের কোনো কবির লেখা এবং আমাদের কোনো সুরকারের সুর করা গান চাই। আমার তখন আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কবিতাটির কথা মনে পড়লো। কিন্তু সুর করবে কে? আমার মনে পড়ে গেল লতিফ ভাইয়ের কথা, যিনি আমাদের মুকুল ফৌজে অনেক উদ্দীপনামূলক গান শিখিয়েছেন। আমি সেই লিফলেট থেকে কবিতাটি টুকে নিয়ে লতিফ ভাইর বাড়ি গেলাম। তিনি নাজিমুদ্দিন রোডে তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানের কাছে থাকতেন। তাকে কবিতাটি নিয়ে অনুরোধ জানালাম, এটিতে সুর দিয়ে গানে রূপান্তরিত করতে আর একুশে সন্ধ্যায় ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে ঢাকা কলেজের অনুষ্ঠানে আতিকদের নিয়ে গাইতে। লতিফ ভাই বা আবদুল লতিফের একটা মস্ত গুণ ছিল তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনা করার। তিনি একটি গান লিখে সঙ্গে সঙ্গে সুর করে ফেলতে পারতেন। লতিফ ভাই রাজি হয়ে গেলেন, কাজটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ লতিফ ভাই রেডিওতে গান আর গানের টিউশনি করে চলতেন। রেডিও পাকিস্তানে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জেনেও তিনি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ কবিতাটিতে সুরারোপ করে গানে রূপান্তরিত করে ফেললেন। ঠিক হলো ঢাকা কলেজের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে গানটি প্রথম পরিবেশিত হবে।

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, প্রথম শহীদ দিবস। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোনো কলা ভবনে (বর্তমান মেডিক্যাল কলেজের পূর্ব দিকের অংশে তখন অবস্থান ছিল) কালো পতাকা উড়িয়ে প্রভাতফেরি বের করলাম। গাজী ভাইয়ের ‘ভুলবনা ভুলবনা, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গাইতে গাইতে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে (এখন যেখানে মেডিক্যাল কলেজ ডিসপেনসারি ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, যেখানে সারি সারি মুলিবাঁশের ব্যারাকে মেডিক্যাল হোস্টেল ছিল) ধ্বংস করা শহীদ মিনারের স্থানে কালো কাপড় ঘেরা প্রতীকী শহীদ মিনারে এবং আজিমপুর গোরস্তানে ভাষা শহীদ আবুল বরকত ও সফিউর রহমানের কবরে ফুল দিলাম। প্রথম ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিনের কবরের কোনো চিহ্ন আমরা খুঁজে পেলাম না, মাথার খুলি উড়ে যাওয়া শহীদ রফিকউদ্দিন, রিকশাচালক আবদুল আউয়ালের লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিল। বায়ান্নর ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারির অধিকাংশ লাশ পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, এরপর আমরা ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে গেলাম, সেখানে তখন এলাহি কাÐ, ঢাকা ও ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল শামসুজ্জামান চৌধুরী, উর্দুর অধ্যাপক ও কবি আহসান আহমদ আশক আর ইডেন কলেজের প্রিন্সিপাল ফজিলাতুন্নেসা জোহা, তাদের সঙ্গে বিরাট পুলিশ বাহিনী। ছাত্রছাত্রীরা শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ শেষ করে এলেও ঢাকা ও ইডেন কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের নিরস্ত্র করতে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ বাহিনীকে আদেশ দিলেন শহীদ মিনার ভেঙে ফেলতে। শত শত ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীর সামনে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলা হলো, এভাবেই ভাষা শহীদানের স্মৃতিতে নির্মিত দ্বিতীয় শহীদ মিনারটিও ভেঙে দেওয়া হলো, শিক্ষকদের হস্তক্ষেপে ছাত্র-পুলিশ সংঘাত এড়ানো সম্ভব হলো। ঢাকা কলেজের ছাত্ররা বুদ্ধি করে কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন না করে তখনকার দিনের পল্টন মাঠে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিদেশি সৈনিকদের জন্য নির্মিত ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে মূলত গণসংগীত পরিবেশিত হয়েছিল ঢাকা কলেজের ছাত্রদের কণ্ঠে, যার অধিকাংশই ছিল গণনাট্য সংঘের সংগ্রামী গান। এ ছাড়া তারা রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’, অতুল প্রসাদের ‘মোদের গরব মোদের আশা’ নজরুলের ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানগুলো করেছিল। অনুষ্ঠানের শেষ গান ছিল আবদুল লতিফের নেতৃত্বে ঢাকা কলেজের আতিকুল ইসলাম প্রমুখ কয়েকজন শিল্পীর কণ্ঠে আবদুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।’ গানটি মূলত আবদুল লতিফই গেয়েছিলেন, ছাত্রশিল্পীরা শুধু প্রথম পঙক্তিতে কণ্ঠ দিচ্ছিল। ওই অনুষ্ঠানে যে গানটি পরিবেশিত হবে তা আবদুল লতিফ, আতিকুল ইসলাম এবং আমি ছাড়া কেউ জানত না। আবদুল লতিফ যখন গানটি কয়েকজন ছাত্রশিল্পীকে নিয়ে পরিবেশন করেন তখন মিলনায়তনে উপস্থিত ছাত্রজনতা বিস্ময়ে অভিভ‚ত হয়ে হতবাক হয়ে যান, অনেকের চোখ দিয়ে নীরবে পানি পড়ছিল। ওই গানটির রেশ অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলেও অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল। ওই গানের এবং শহীদ মিনার তৈরির অপরাধে ঢাকা কলেজের ছাত্র ইকবাল আনসারী খান, ইনাম আহমদ চৌধুরী, আতিকুল ইসলামসহ প্রায় দশ-বারোজন ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত করা হয়েছিল। আবদুল লতিফকে পুলিশের আইজি বা গোয়েন্দাদের ঝামেলা পোহাতে হয় অনেক দিন। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম শহীদ দিবস পালনে এভাবেই ঢাকা কলেজ এক ইতিহাস সৃষ্টি করে।

আবদুল লতিফ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটির যে সুর করেছিলেন তা ছিল করুণ এবং বেদনাবিধূর। তবে একক কণ্ঠে পরিবেশনায় উপযোগী, পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের শহীদ দিবসেও তিনি ওই গানটি এবং নিজের রচনা ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইরা নিতে চায়’ গানটি পরিবেশন করে বাংলায় ভাষার গানের এক নতুন ঐতিহ্য সংযোজন করেন। শিল্পী আলতাফ মাহমুদ বরিশালের সন্তান, আবদুল লতিফ ও আলতাফ মাহমুদ উভয়ের বাড়ি বৃহত্তর বরিশাল জেলায়। স্বাভাবিকভাবেই আলতাফ মাহমুদ বরিশাল থেকে ঢাকা এসে প্রথম আবদুল লতিফের স্নেহ ও সাহায্য পান এবং ঢাকার গণসংগীতশিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেন। পরে তিনি শেখ লুৎফর রহমানের সুরে অনেক গণসংগীত করেছেন। আলতাফ মাহমুদ প্রথম আবদুল লতিফের সুরেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি করতেন, তারপর তিনি করাচি চলে যান এবং ছায়াছবির সংগীতশিল্পী ও পরিচালক হয়ে ওঠেন। পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে তিনি ঢাকা ফিরে আসেন। তখন শহীদ দিবস পালন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে বর্তমান শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও তত্ত¡াবধানে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। ৫৮ সালে পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি হওয়ায় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি; কিন্তু শহীদ দিবসে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য শোভাযাত্রা সেই অসমাপ্ত শহীদ মিনারে এসেই পুষ্প প্রদান করেছে। সে সময় গেন্ডারিয়া থেকে আলতাফ মাহমুদ গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে মেয়েদের প্রভাতফেরির একটি দল নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি গাইতে গাইতে শহীদ মিনারে এলো, আমরা সেই প্রথম আলতাফ মাহমুদের সুরে গানটি শুনলাম। লতিফ ভাইয়ের সুরটি ছিল ঢিমালয়ে একক কণ্ঠে গীত হওয়ার জন্য আলতাফ মাহমুদের সুরটি তুলনামূলকভাবে দ্রুতলয়ে সমবেত কণ্ঠে গাইবার উপযোগী। আলতাফ মাহমুদের সুরটি আবেদন স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলকভাবে বেশি এবং এ সুরটিই সর্বজনগ্রাহ্য একটি অমর ও চিরকালীন সুরে পরিণত হয়।

"