কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

প্রকাশ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

মাহবুব উল আলম চৌধুরী

এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে

রমনার ঊর্ধ্বমুখী কৃষ্ণচ‚ড়ার তলায়

যেখানে আগুনের ফুলকির মতো

এখানে-ওখানে জ্বলছে অসংখ্য রক্তের ছাপ

সেখানে আমি কাঁদতে আসিনি।

আজ আমি শোকে বিহবল নই

আজ আমি ক্রোধে উন্মত্ত নই

আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল।

যে শিশু আর কোনোদিন তার

পিতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার

সুযোগ পাবে না

যে গৃহবধূ আর কোনোদিন তার

স্বামীর প্রতিক্ষায় আঁচলে প্রদীপ

ঢেকে দুয়ারে আর দাঁড়িয়ে থাকবে না

 

যে জননী খোকা এসেছে বলে

উদ্দাম আনন্দে সন্তানকে আর

বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না

যে তরুণ মাটির কোলে লুটিয়ে

পড়ার আগে বারবার একটি

প্রিয়তমার ছবি চোখে আনতে

চেষ্টা করেছিল

সে অসংখ্য ভাইবোনের নামে

আমার হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত

যে ভাষায় আমি মাকে সম্বোধনে অভ্যস্ত

সেই ভাষা ও স্বদেশের নামে

এখানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে

আমি তাদের ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি

যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে

নির্বিচারে হত্যা করেছে।

 

ওরা চল্লিশজন কিম্বা আরো বেশি

যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে রমনার রৌদ্রদগ্ধ

কৃষ্ণচ‚ড়ার গাছের তলায়

ভাষার জন্য মাতৃভাষার জন্য বাংলার জন্য।

যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে

একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার জন্য

আলাওলের ঐতিহ্য

রবীন্দ্রনাথ, কায়কোবাদ, নজরুলের

সাহিত্য ও কবিতার জন্য

 

(যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে

পলাশপুরের মকবুল আহমদের

পুঁথির জন্য

রমেশ শীলের গাথার জন্য,

জসীমউদদীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য।)

 

যারা প্রাণ দিয়েছে

ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল

নজরুলের ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি

আমার দেশের মাটি।’

এ দুটি লাইনের জন্য

দেশের মাটির জন্য,

রমনার মাঠের সেই মাটিতে

কৃষ্ণচ‚ড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো

চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর

অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে

আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।

রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সেরা কোনো

ছেলের বুকের রক্ত।

আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটি রক্তকণা

রমনার সবুজ ঘাসের ওপর

আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে

এক একটি হীরের টুকরোর মতো

বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন

বেঁচে থাকলে যারা হতো

পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

যাদের মধ্যে লিংকন, রঁল্যা,

আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল

যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল

শতাব্দীর সভ্যতার

সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,

সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে

আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।

যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে

যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে

আমরা তাদের কাছে

ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ।

আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির দাবি নিয়ে।

"