কবিতায় একুশ বাঙালি জাতিসত্তার শব্দপ্রত্যয়

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ফকির ইলিয়াস

আ বদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কাছে জানতে চাই, আপনার একুশের গান নিয়ে কিছু বলুন। তিনি হাসেন। বলেন, ‘কীইবা করতে পারলাম! এই গানটি শুনি বারবার। ভাবিনি এতটা জনপ্রিয়তা পাবে!’

বলি, রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। আর আপনি আমাদের একুশের গানের! আপনি যে জীবদ্দশায় অমরতা দেখে যাচ্ছেন, তা কি ভেবেছেন!

তিনি বলেন, ‘আরে দূর, ওসব পাওয়ার জন্য তো গানটি লেখিনি।’

১৯৯২-এর তেমনি একটি দুপুরের আড্ডা আমাদের প্রাণবন্ত হয়ে উঠে, লন্ডনে ‘সাপ্তাহিক নতুন দিন’ অফিসে। আবদুল গাফফার চৌধুরী স্মৃতিকথা শোনান। জানান, সেই দিনগুলোর কথা।

নিজের ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাস বাঙালি জাতির। তাই এ জাতির একটি বিশেষ গর্ব তো রয়েছেই। কারণ হায়েনাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সেদিন বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন তরুণরা। এটাই আত্মত্যাগ। যে কাজটি করার সুযোগ ও সময় মানুষের জীবনে বারবার আসে না।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি যে ইতিহাস নির্মিত হয়েছিল, সেই ভাষার আলোকিত বিন্যাস যুগে যুগে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে আমাদের কবিদের হাতে। তারা ভালোবাসায়, দেশপ্রেমে, মাতৃপ্রেমে প্রকাশ করে যাচ্ছেন তাদের আকুতি বাংলা কবিতায়।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলার মাটি রক্তাক্ত হওয়ার পর প্রকাশিত যে সংকলনটিকে আমরা এখনো দর্পণ হিসেবে মান্য করি; সেটি হচ্ছে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন।

একুশে ফেব্রুয়ারি প্রকাশের মধ্য দিয়েই পুঁথিপত্র প্রকাশনী হয়ে উঠেছিল। লেখাগুলো হাসান হাফিজুর রহমান জোগাড় করেছিলেন প্রায় একক প্রচষ্টোয়। দেরি করায় আলাউদ্দিন আল আজাদ তার কবিতাটি তুলে দিয়েছিলেন মোহাম্মদ সুলতানের হাতে।

প্রচ্ছদপট এঁকেছেন আমিনুল ইসলাম। পাইওনিয়ার প্রেসের পক্ষে এম এ মুকিত ছেপেছিলেন। ব্লক তৈরি করেছিলেন এইচম্যান কোম্পানি, বাদামতলী, ঢাকা।

প্রথম প্রকাশ মার্চ, ১৯৫৩। দাম দুই টাকা আট আনা।

বইটির উৎসর্গপত্রে লেখা হয়েছিল, ‘যে অমর দেশবাসীর মধ্যে থেকে জন্ম নিয়েছেন একুশের শহীদরা, যে অমর দেশবাসীর মধ্যে অটুট হয়ে রয়েছে একুশের প্রতিজ্ঞা; তাদের উদ্দেশে।’ এটি ছিল আনিসুজ্জামানের হাতের লেখায়। পুঁথিপত্র লোগোটি তৈরি করেছিলেন মূর্তজা বশীর। বইটি ছিল ক্রাউন সাইজে। পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৮৩।

‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক এ বিষয়ে একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে একুশের চেতনাধৃত কবিতা, নাটক, গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে মূর্তজা বশীরের স্কেচশোভিত এ সংকলন নানাদিক বিচারে ঐতিহাসিক মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য।’

ওই একুশের কবিতা শিরোনামে সংকলিত হয়েছিল একগুচ্ছ কবিতা। তাতে শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতা সংকলিত হয়। সেসব কবিতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল মাতৃভাষার জন্য আবেগময় আকুলতা, শহিদদের জন্য গভীর বেদনা ও শ্রদ্ধা আর হিংস্র শাসকদের বিরুদ্ধে দ্রোহ এবং ক্রোধের আগুন। এভাবেই পথচলা শুরু করে একুশের কবিতা। বাংলা ভাষায় প্রথম একুশের কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। কবিতাটি রচনা করেছেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী।

একুশে নিয়ে কবিতা লিখে আমাদের শানিত করেছেন আমাদের প্রায় সব কবি। তা থেকে কিছু উদ্ধৃতি এখানে দিতে চাই।

 

১। বারবার ফিরে আসে রক্তাপ্লুত শার্ট

ময়দানে ফিরে আসে, ব্যাপক নিঃসর্গে ফিরে আসে,

ফিরে আসে থমথমে শহরের প্রকান্ড চোয়ালে।

হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে, ঘোরে হাতে হাতে,

মিছিলে পতাকা হয় বারবার রক্তাপ্লুত শার্ট।

বিষম দামাল দিনগুলো ফিরে আসে বারবার,

বারবার কল্লোলিত আমাদের শহর ও গ্রাম।

 

‘আবার আসব ফিরে’ বলে সজীব কিশোর

শার্টের আস্তিন দ্রুত গোটাতে গোটাতে

সেøাগানের নিভাঁজ উল্লাসে

বারবার মিশে যায় নতুন মিছিলে, ফেরে না যে আর।

[শামসুর রাহমান]

 

২। শেকলে বাঁধা শ্যামল রূপসী, তুমি-আমি, দুর্বিনীত দাসদাসী-

একই শেকলে বাঁধা পড়ে আছি শতাব্দীর পর শতাব্দী।

আমাদের ঘিরে শাঁইশাঁই চাবুকের শব্দ, স্তরে স্তরে শেকলের ঝঙ্কার।

তুমি আর আমি সে গোত্রের যারা চিরদিন উৎপীড়নের মধ্যে গান গায়-

হাহাকার রূপান্তরিত হয় সংগীতে-শোভায়।

[হুমায়ুন আজাদ]

 

৩। ভেতর মহলে খুব চুনকাম, কৃষ্ণচূড়া

এই তো ফোটার আয়োজন

বাড়িঘর কী রকম যেন তাকে হলুদ অভ্যাসবশে চিনি,

হাওয়া একে তোলপাড় করে বলে, একুশের ঋতু!

ধীরে ধীরে সন্ধ্যার সময় সমস্ত রং মনে পড়ে, সূর্যাস্তের

লীন সরলতা

হঠাৎ আমারই জামা সূর্যাস্তের রঙে ছেয়ে যায়,

আর আমার অজ্ঞাতে কারা আর্তনাদ করে ওঠে রক্তাক্ত রক্তিম

বলে তাকে!

[মহাদেব সাহা]

আমাদের খ্যাতিমান কবি আল মাহমুদ তার ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’Ñ কবিতায় লিখেছেন

 

পাহাড়তলির মরণ চূড়ায়

ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,

ফেব্রুয়ারির শোকের বসন

পরল তারই ভগ্নি।

 

প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি

আমায় নেবে সঙ্গে,

বাংলা আমার বচন,

আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।’

বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ‘একুশের কবিতা’ নামে একটি সংকলন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত একুশ নিয়ে লেখা ১১৫ জন কবির ১৩২টি কবিতা এতে সংকলিত হয়েছে। সংকলিত কবিতাগুলো বাংলা ও ইংরেজিÑ এই দুই ভাষায় প্রকাশিত। কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে জসীম উদ্দীনের ‘একুশের গান’, সুফিয়া কামালের ‘এমন আশ্চর্য দিন’, আহসান হাবীবের ‘একুশে ফেব্রুয়ইর’, ফররুখ আহমদের ‘ভাষা আন্দোলনের নিহত আত্মার প্রতি’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, আবদুল গণি হাজারীর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, আবুল হোসেনের ‘তোমাকে নিয়ে যত খেলা’, সানাউল হকের ‘অমর একুশে’, আবদুল লতিফের ‘একুশের গান’, শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা আমার দুখিনী বর্ণমালা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘একুশের কবিতা’, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর ‘একুশের গাথা’, ফজল শাহাবুদ্দীনের ‘আত্মা থেকে একটি দিন’, আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘কৃষ্ণচূড়ার মেঘ’, দিলওয়ারের ‘একুশের কবিতা’, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘একুশের কবিতা’, বেলাল চৌধুরীর ‘বর্ণমালার নিরস্ত্র সাহস’, হায়াৎ মামুদের ‘ঘুরে ফিরে ফাল্গুন’, শহীদ কাদরীর ‘একুশের স্বীকারোক্তি’, রফিক আজাদের ‘পঞ্চানন কর্মকার’, আসাদ চৌধুরীর ‘ফাল্গুন এলেই’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’, মোহাম্মদ রফিকের ‘মহান একুশে’, মহাদেব সাহার ‘তোমরা কি জান’, নির্মলেন্দু গুণের ‘আমাকে কী মাল্য দেবে দাও’, হুমায়ুন আজাদের ‘বাংলা ভাষা’, আবুল হাসানের ‘মাতৃভাষা’, মাহবুব সাদিকের ‘অবিনাশী বাংলা’, আবুল মোমেনের ‘আমি কি ভুলিতে পারি’, অসীম সাহার ‘মধ্যরাতের প্রতিধ্বনি’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘মাতৃভাষা’ ইত্যাদি।

একুশ নিয়ে কবিতা লেখায় আমরা এ সময়ে পরিবর্তন লক্ষ করছি। চলমান সময়ের কবিরা, একুশ নিয়ে কবিতা লিখছেন সমকালকে ধারণ করে। তারা তুলে ধরছেন আমাদের গৌরবের আখ্যান। উঠে আসছে ডিজিটাল ফোনটিকে লেখা বাংলা ভাষার আখ্যানও। কবিতা এখন লেখা হচ্ছে মুঠোফোনে। আমাদের আরেক নান্দনিক দ্রোহী কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন বইÑ মুঠোফোনে লেখা কবিতা নিয়ে। এই যে কাব্যভাষার অগ্রগতি তা সবই সম্ভব হয়েছে আমাদের বাংলা ভাষার বিকিরণের কারণেই। এ সময়ের কিছু কবিতা পড়া যাকÑ

[ক]

রক্তসমুদ্রের তুমুল গর্জনের মধ্যে যখন তোমার যাত্রা

হলো, তখন তোমাকে স্বাগত জানিয়েছিল একটি

কৃষ্ণগহ্বর। এ কথা কে বিশ্বাস করবে আজ!

কিন্তু তুমি থামলে না। অথচ একমাত্র তুমিই

জানতে, তোমার দীর্ঘ যাত্রাপথে ছায়ার মতো

সেঁটে ছিল তারা। একপাশে রক্তসমুদ্র, অন্যপাশে

কৃষ্ণগহ্বর। এ কথা কে বিশ্বাস করবে আজ!

[এ কথা কে বিশ্বাস করবে আজ/মিনার মনসুর]

[খ]

শব্দের পর শব্দ জমে পাহাড় জেগে ওঠে। সেই ওজস্বী পাহাড়ের ক্ষয়ী ভবনের গানে গানে ছবি আঁকি বিচিত্র জীবনচর্চার। পাহাড়ের বুকে গাছ ওঠে। আকাশের দিকে হাত তুলে গাছের সব গৌর-নিতাই হয়ে যায়। গোপন কথার মতো জীবনের ধাপে ধাপে বাঁক নেয় একটা নদী। আমি আমার ভাষার ডিঙা ভাসাই। ঢেউয়ের ছন্দে শব্দ সাজাই চর্যা পদাবলির, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কথা ভেসে আসে। দূর থেকে নিশান তোলেন কৃত্তিবাস। একটা স্নেহ হাতে কাশীরামের সহযাত্রী হয়ে যান সমস্ত মঙ্গলকবি। .

[বাংলা /অভিজিৎ পাল]

কবিতায় একুশে থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতে লিখিত হবে একুশের কবিতা। এই অর্জন আমাদের ভাষার, আমাদের বর্ণের, আমাদের অক্ষরের। কবিতা আমাদের দ্রোহী হতে শিখিয়েছে, এই একুশের চেতনায়ই।

 

"

সর্বাধিক পঠিত