বাঙালিত্ব, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

ডা. এস এ মালেক

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ভাষা আমাদের ভিত্তি। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হয়েছিল। তাই এই ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বপ্রথম বায়ান্নর ভাষা শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার লেখা শুরু করছি। অনেকেই জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন সাধনার বলে। সবাই তার প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে জগদ্বিখ্যাত হতে চান। তাই কেউ বিজ্ঞানী, কেউবা সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ বা সমাজসংস্কারক, গবেষক, দার্শনিক, চিকিৎসক ইত্যাদি। আজ আমি একজন স্বনামধন্য কবির জীবন কাহিনি নিয়ে লেখার শুরুতে উল্লেখ করতে চাই, যিনি একজন স্বনামধন্য বাঙালি, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গিয়ে শোনা যায় বাংলা ভাষায় কথাবার্তা বলা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী এই কবি পরবর্তীতে এমন জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব সৃষ্টি। সুতরাং বাংলার প্রতি যে তার বিরূপ কোনো মনোভাব ছিল তা নয়, হয়তো তাকে কিছু সময়ের জন্য পরিবেশের দাস হতে হয়েছিল। এত আগের কথা বলতে যাচ্ছি কেন, এখনো প্রবাসী বাঙালিরা ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। হয়তো বিদেশেই তাদের জন্ম অথবা এত ছোটকালে দেশত্যাগ করেছে যে, মায়ের ভাষাকে আপন করে নিতে পারেনি। আবার একশ্রেণির শিক্ষিত সম্প্রদায় রয়েছে, যাদের সংখ্যা অনেক, সাধারণ কথাবার্তা বলতে গেলেও তারা ইংরেজি শব্দকে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে জগাখিচুড়ি করে ফেলেন। বলা যেতে পারে, এদের কিছুসংখ্যক ইংরেজি ভাষাকে অপেক্ষাকৃত উত্তম বিবেচনা করে সেই ভাষায় কথা বলেন ও লেখেন। অনেকেই আবার ভালো বাংলা না জানার কারণে মনের পূর্ণ ভাব বিকাশের স্বার্থে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করেন। আসলে মায়ের প্রতি যার দরদ আছে, তিনি মাতৃভাষায় কথা বলবেন না কেন? শৈশবে তো মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েই শব্দ চয়নের শিক্ষা। প্রথম বুলিই তো মা। তারপর মায়ের কাছ থেকেই অতি প্রয়োজনীয় শব্দগুলো তাকে শিখতে হয়। তাই ভাষার প্রতি মমত্ববোধ প্রতিটি মানুষের রয়েছে। একসময় ছিল যখন অনেকের মতো আমাদের ভাষা সমৃদ্ধ ছিল না। পরিচিতিও ছিল কম। কিন্তু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো সে বাধা ভেঙে দিলেন। বাংলা যে একটা ভাষা, উন্নত ও মর্যাদার ভাষা, তা তো রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন।

সমাজ দর্শনের মতো সাহিত্যের একটা দর্শন আছে। ক্রমবিবর্তনের ধারায় তা পরিবর্তন ঘটে। বাংলা সাহিত্যও ক্রমবিকাশের ধারায় বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছে। যারা সাহিত্যকর্মে আত্মনিয়োগ করেছেন, তাদের চিন্তাচেতনা, ভাবধারা ও শৈল্পিক ভঙ্গি সাহিত্য সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। ধরা যাক, রবীন্দ্রসংগীত, রবীন্দ্র সাহিত্য ও রবীন্দ্র শিল্পকর্ম কবিগুরুর অনন্য কীর্তি। মহাকালকে জয় করার প্রতিভা নিয়ে তার জন্ম হয়েছিল। সাহিত্য সম্পর্কে আমার বিশেষ পড়াশোনা নেই। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলি থেকে কেউ যদি উদ্ধৃতি দেন বা শরৎ সাহিত্যের বিশেষ উক্তি তুলে ধরে পার্থক্যটা বুঝতে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না।

সাহিত্যের অঙ্গন সুদূর বিস্তৃত। প্রবন্ধ বলতে যা বোঝায়, তা কবিতার ভাষা নয়। আবার গান ও কবিতার পার্থক্য খুব বেশি সীমাহীন না হলেও আছে। কবির একটা গান যে সুরে গাওয়া যায়, ঠিক সেই স্বর ও সুরে আবৃত্তি করা যায় না। রবীন্দ্রসংগীত বলতে এমন এক কোমল অন্তরস্পর্শী সুরকে বোঝায়, তা সত্য সত্যই হৃদয়কে শান্ত করে তোলে। আবার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল যখন বিদ্রোহী ভাষায় ভগবানের বুকে পদচিহ্ন আঁকতে চান, তখন কবিতায় প্রকাশ পায় চরম বিদ্রোহের সুর। আসলে সীমিত জ্ঞান নিয়ে কঠিন তত্ত্বের চর্চা করতে গিয়ে কী লিখব বা লিখব না, বুঝে উঠতে পারছি না। মনে হয় দেশের জ্ঞানীগুণীরা আমার এই লেখা পড়ে অট্টহাসি দেবে।

ভাষা আন্দোলনের মাস ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মনটা বেশ কিছুটা উত্তাল ও অস্থির। বয়স এখন পঁচাশি, শরীর ভীষণ অসুস্থ। চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী শহিদ বেদিতে বোধহয় আর কোনো দিন শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারব না। ঘরে বসে কী করি। লেখার অভ্যাস আছে, তাই লেখা। আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের ভাষা, বাংলা আমাদের দেশ। বঙ্গবন্ধু এ দেশকে উপহার দিয়েছেন। তার জীবন-সংগ্রামের ফসল আজকের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি আকর্ষণ ছিল অত্যন্ত প্রবল। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি নজরুল ইসলামের কবিতা তিনি প্রায়ই গানের ছলে গাইতেন। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবে তাকে গাইতে শোনা গেছে, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে/তবে একলা চল রে।’

বাংলা ভাষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর এমন মমত্ববোধ তার অন্তর্নিহিত জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ভাষা থেকে যে চেতনার উন্মেষ ঘটেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বঙ্গবন্ধু অনেক লেখালেখি করেছেন, বাস্তবতা বোধহয় এরূপ নয়। কিন্তু দীর্ঘ কারাবাসে নিভৃত কক্ষে একান্তে কলম ও কাগজ নিয়ে সৃষ্টি, তার কন্যা শেখ হাসিনার কারণে গ্রন্থাবলি প্রকাশ হচ্ছে। চরম প্রতিকূল অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টি সাহিত্যকর্ম; যা আত্মপ্রকাশের স্বার্থে তিনি সৃষ্টি করেছেন, যাকে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বলে অভিহিত করা যায়। অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা গণচীনÑ এই বইগুলো কত বাস্তব ও উপভোগ্য তার লেখনী। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যক্তির জীবনকে তুলে ধরা অনেক জ্ঞানীগুণীর পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কাটছাঁট করে, মার্জিত করে প্রকাশ করার দৃষ্টিভঙ্গি তার লেখনীতে দেখা যায়নি। সহজ, সরল, সৎ ও নিবেদিত এই মহান নেতার লেখা পড়লে বোঝা যায়, কর্মের চাইতেও চিন্তার ক্ষেত্রে তার সততার মানদন্ড ছিল অনেক উঁচুতে। এজন্যই তার পক্ষে অপূর্ব সাহিত্য সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। তার লেখনীর আবেদন হৃদয়স্পর্শী। জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাকে এমন সূক্ষ্ম ও সুন্দরভাবে তার লেখনীতে তুলে ধরেছেন এবং এত সহজভাবে তা হয়েছে, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অসাধারণ সাহিত্য সৃষ্টি বলে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে কারাগারের রোজনামচা যেসব উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে তা শুনলে মনে হয়, বাংলা ভাষার ওপর বঙ্গবন্ধুর দখল ছিল সীমাহীন। অসাধারণ ঘটনাগুলো তিনি এমনভাবে সাধারণ ভাষায় বর্ণনা করেছেন, মানুষ সহজেই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে। জেলে থাকার সময় তুচ্ছ ঘটনা যে মোটেই তুচ্ছ নয়, তা তিনি বর্ণনাচ্ছটায় তুলে ধরেছেন।

বঙ্গবন্ধুর হাতের লেখা অনেক চিঠি প্রবীণ কর্মীদের কাছে সুরক্ষিত আছে। এ ধরনের বেশ কিছু চিঠি দেখার সুযোগ হয়েছে। মনে হয়েছে যে, চিঠির ভাষা তার হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার অভিব্যক্তি ঘটেছে। নির্যাতিত নিবেদিত একজন নিরীহ কর্মী যখন সান্ত্বনার এই চিঠিটি পেয়েছেন, তার দুঃখ-কষ্ট অনেকটাই দূর হয়েছে।

তার মতো খাঁটি বাঙালির চেয়ে বাংলা ভাষার প্রতি দরদ আর কার বেশি থাকবে। আমার মনে আছে, ১৯৬৫-৬৬ সালের দিকে একবার লঞ্চে আমরা ফরিদপুরের অনেক নেতাকর্মীসহ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পদ্মা নদী অতিক্রম করছিলাম। হঠাৎ তিনি লঞ্চ থামাতে বললেন। চারদিকে জালে ইলিশ পড়ছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, কত লোক আছে ওই লঞ্চে। হিসাব করে দেখা গেল, ১০টা ইলিশ মাছ হলে হবে। ১০টা মাছ কিনে ভেজে সবাইকে নিয়ে তিনি খেলেন। যারা সেদিন ওই লঞ্চে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন তারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলেন যে, সাধারণ মানুষের জন্য এত বড় বন্ধু তখন কেউ ছিল না। তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, তিনি দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। এবং খুব বেশি ভালোবাসেন। সেদিনের দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে। ফ্লোরে বসে লুঙ্গি পরে যে বাঙালি, আর তিনি ভবিষ্যতে বাঙালি জাতির পিতা হয়ে মিশে গেছেন জনতার কাতারে। বাঙালির পোশাক পায়জামা পাঞ্জাবি ও মুজিব কোট তার পরনে খুব মানাত। যদিও বিদেশে গিয়ে তাকে ভিন্ন পোশাক পরতে হয়েছে। তবে ওই পোশাকে আর আল্লাহ প্রদত্ত অসীম সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটত না। পুরোনো গণভবনের ভেতরের বারান্দায় এক দিন তাকে দেখলাম বসে আছেন পায়জামা পাঞ্জাবি ও চাদর গায়ে। গেট থেকে তাকে দেখা যাচ্ছে। দেখে মনে হলো, তিনিই এই বাড়ির সৌন্দর্য। দালানকোঠা নয়। বঙ্গবন্ধুর সৌন্দর্যই ওই বাড়ির শোভাবর্ধন করছে। শুধু বাংলা ভাষা নয়, সাধারণ ভাষায় বক্তৃতায় তিনি যেভাবে সম্বোধন করেছেন, ভাইয়েরা আমার, দাবাইয়া রাখতে পারবা না, মরতে যখন শিখেছি এই এক অপূর্ব শব্দচয়ন।

পিতার কথা বলতে গেলেই মেয়ের কথা মনে পড়ে। সাক্ষাৎ প্রতিনিধি, সবকিছুর। সাহিত্যকর্মে আগ্রহ। বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী। অনর্গল বলে যান। লিখেছেন অনেক বই। সাহিত্যকর্মে তিনিও পিছিয়ে নেই। খাঁটি বাঙালি। বাংলা ভাষার ওপর দরদ। ইংরেজি বলতে বোধহয় বেশ কিছুটা অনীহা। রাজনৈতিক চর্চা করতে গিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি অনাপ্রয়াসেই হয়ে গেছে। পিতার মতো ভাষার প্রতি গভীর দরদ, শিল্পকর্মে গভীর আগ্রহ, জীবনের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যে, তিনি বিচরণ করছেন না। আঠারো ঘণ্টা কাজ করেন। বই পড়ার সময় কোথায়?

আসলে সমাজ থেকে যা শিখেছেন, তাইতো বইতে লেখা আছে। অমূল্য জ্ঞানের ভান্ডার। বিজ্ঞান, দর্শন, কলা, সাহিত্য, রাজনীতি, কৃষি, শিল্পকর্ম প্রভৃতি ক্ষেত্রে তার পদচারণা। তবে সবার ওপরে বাঙালি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে তার পথচলা। পিতার স্বাধীন করা দেশ এক কাক্সিক্ষত রাষ্ট্রে পরিণত করতে কাজ করে যাচ্ছেন। সুযোগ পেলেই লেখেন। বিষয় : রাজনীতি। কিন্তু বহিঃপ্রকাশ সাহিত্যে, শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে। পিতা ও কন্যা বাঙালির গৌরবে গৌরবান্বিত। প্রমাণ করেছেন, খাঁটি বাঙালি না হলে দেশকে ভালোবাসা যায় না। তাই পিতা ও কন্যা স্বভাবজাত খাঁটি বাঙালি। চালচলন, চলাফেরা, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, ব্যবহার সবকিছুতেই আদর্শ বাঙালির ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনীতিক

 

"