অর্থনীতিতে বাংলা নববর্ষের অবদান

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

মাহবুবুল আলম

বঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। সরকারি হিসাব মতে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়ে আসছে। বর্তমানে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ার রমরমা প্রচারণায় বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাই চৈত্র মাস শুরুর পর থেকে কী গ্রাম, কী শহর সর্বত্রই বাংলা নববর্ষকে বরণের লক্ষ্যে বাংলার ঘরে ঘরে নানা আয়োজন শুরু হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের নববর্ষের পোশাকে সাজের আয়োজন দেখেই বোঝা যায় বাংলা নববর্ষ যেন জাগ্রত দ্বারে।

তাই বাংলা নববর্ষের দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে, বাঙালিদের হৃদয়ের উচ্ছ্বাস পারদের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে হৃদয়ে অনুরণিত হতে থাকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই বিখ্যাত গান-

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর,/তোরা সব জয়ধ্বনি কর,/ওই নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়!/তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’

আর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত সেই গান যা অবধারিতভাবে এখন বাংলা নববর্ষের থিম সঙ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই কালজয়ী গান বৈশাখ এলেই সবাই গুনগুন করে একবার হলেও গায়Ñ

‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে/মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বছরের আবর্জনা যাক মুছে যাক/যাক যাক, এসো এসো।’

বাঙালির জীবনে নববর্ষের প্রভাব অনস্বীকার্য। বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশি তথা বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে-নগরে, গ্রামগঞ্জে বাংলা নববর্ষ আনন্দ-উল্লাসে উদযাপিত হয়। বাংলা নববর্ষে প্রতিটি বাঙালি বিগত বছরের সমাপ্তি এবং সমাগত বছরের আবির্ভাবের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। গ্রাম-গ্রামান্তরে বটের তলায় আয়োজন হয় বৈশাখী মেলার। বাংলা নববর্ষের সার্বজনীন অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে বার্ষিক মেলার আয়োজনও এটি। আর হালখাতা হলো পহেলা বৈশাখের একটি সার্বজনীন আচার বা রীতি। আমাদের দেশের সব শ্রেণির ব্যবসায়ীর অর্থাৎ দেশীয় ধরনে যারা ব্যবসায়ের হিসাব রাখেন, তাদের মধ্যেই এ অনুষ্ঠানটির প্রচলন এখনো বর্তমান।

যাক এখন আমি সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করতে চাই নববর্ষ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটুকু অবদান রাখছে। ইদানীংকালে বৈশাখ ঘিরে পুরো দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান। তবে পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষকে ঘিরে ঠিক কী পরিমাণ অর্থের জোগান বা পরিবর্তন আসে, তার সঠিক হিসাব নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে তা হবে আনুমানিক তা প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার মতো। একসময় পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেওয়ার এই আয়োজন ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। আর এর ওপর ভিত্তি করেই গ্রামীণ নানান অর্থনৈতিক কর্মকা-েরও বিকাশ হয়। কিন্তু ব্যস্ত নগর জীবনেও এখন নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার ছোঁয়া লেগেছে। গ্রামমুখী ওই উৎসব এখন হয়ে উঠেছে শহরমুখী। আর শহরের মানুষ এই উৎসবটি উদ্যাপন করছে নানাভাবে। সে কারণে অর্থনৈতিক কর্মকা- হচ্ছে নগরেও। প্রতি বছরই বাড়ছে এসব অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পরিধি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

বৈশাখী মেলা গ্রাম-বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এসব মেলা একই সঙ্গে প্রয়োজনের এবং বিনোদনের। বৈশাখী মেলা গ্রামের অর্থনৈতিক জীবনকে সচল করে রাখে। মেলায় হাতের তৈরি নানা পণ্যসামগ্রী বেচাকেনা হয়। গৃহস্থরা সারা বছরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র মেলা থেকে কেনেন। ছোটদের জন্য মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, রঙিন বেলুন, ঢোল, ডুগডুগি, ফিতা, পুঁতির মালা, কাচের চুড়ি, ইমিটেশনের গহনা মেলায় বিক্রি হয়। লোকজ পণ্যের মধ্যে মাটির তৈরি নকশি আঁকা ‘শখের হাঁড়ি’, বাঁশ-বেতের তৈরি ঝুড়ি, ধামা, কুলা, চালুনি, লোহার দা-বঁটি, কাস্তে, কোদাল, শাবল, খন্তা, খুন্তি, কাঠের আসবাবপত্র, গরুর গাড়ির চাকা, হাতপাখা, ফুলের ঝাড়ু সবই মেলায় পাওয়া যায়। মেলায় আরো পাওয়া যায় গুড়ের বাতাসা, চিনির দানাদার, কদমা, কটকটি, হাওয়াই মিঠাই, তিলের খাজা, খইসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন দ্রব্য।

বাংলা নববর্ষে সরকারি চাকরিজীবীদের আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছাকে উসকে দিয়েছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ বোনাস পেয়েছে; এর ফলে বৈশাখী বাজারে আসবে গতি। অর্থনীতিতে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। গত দুই বছর বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোতে এই বৈশাখী বোনাস বা নববর্ষ ভাতা রাখা হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখী বোনাস হিসেবে ৩১৭ কোটি টাকা পেলেও বাজারে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে লেনদেন হয়েছে তার কমপক্ষে ১০ গুণ। গত প্রায় এক দশক ধরে বৈশাখী বাজার ফুলে-ফেঁপে উঠলেও এবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বিশেষ বোনাস বাজারকে আরো সমৃদ্ধ করেছে বলে উদ্যোক্তা এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশে ফ্যাশনশিল্পে মোট বিক্রির অর্ধেক বিক্রি হয় রোজার ঈদে। মধ্যবিত্তের বিকাশের সঙ্গে এখন ২৫ ভাগ বিক্রি হয় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। এবার সেটাও অতিক্রম করবে বলে সবার ধারণা।

বৈশাখকে কেন্দ্র করে জমে উঠছে গ্রাম ও শহরের অর্থনীতি। শহরে কম হলেও বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রামের ব্যবসায়ীরা বেচাকেনার পাশাপাশি নতুন বছরের হালখাতা করার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করেন। আর এ কাজটি করতে গিয়ে পুরোনো বছরের পাওনা-দাওনার হিসাব কষছেন ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা। পুরোনো পাওনা আদায় শেষ করে খদ্দেরের নামে নতুন খাতা খোলাই হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে সোনার দোকানদার সবাই ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন। সব ব্যবসায়ীই তাদের সারা বছরের স্থায়ী খদ্দেরদের হালখাতা অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিচ্ছেন। বর্তমান সময়ে আগের চেয়ে পহেলা বৈশাখের ধরন ও ব্যাপ্তি অনেক বেড়েছে। একসময় বর্ষবরণ উৎসব সীমাবদ্ধ ছিল গ্রামে। এখন শহর ছাপিয়ে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে বর্ষবরণের এই উৎসবটি। তাই এ উৎসবটি সব দিক থেকেই সার্বজনীনতা পেয়েছে। সে কারণে পণ্যের গ্রাম ও নগরকেন্দ্রিক বাজারও গড়ে উঠেছে। এ কাজের সঙ্গে বেড়েছে অনেকের কর্মসংস্থান। অন্যান্য বছরের মতো এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আওতায় দেশব্যাপী ছোট-বড় প্রায় ২৬ লাখ দোকান রয়েছে। বৈশাখকে ঘিরে এরই মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়ে গেছে পোশাকের বাজারসহ অন্যান্য বাজারেও। বুটিক ও ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন ডিজাইনের পোশাক নিয়ে হাজির হচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার বুটিক ও ফ্যাশন হাউস রয়েছে।

নববর্ষ উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পেও এখন অর্থনৈতিক প্রভাব বেশ স্পষ্ট। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে অনেকেই বেরিয়ে পড়েন শহর ছেড়ে গ্রামে, আবার কেউ গ্রাম থেকে শহরে আসেন শহরের বৈশাখ উদযাপন দেখতে। আবার কেউ যান পর্যটন এলাকাগুলোয়। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও সিলেট। কেউ যান একা, আবার কেউ যান পরিবার পরিজন নিয়ে। তাই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে পর্যটন এলাকার হোটেল-মোটেল-রেস্তরাঁসহ সব ধরনের ব্যবসায়ীই এখন ব্যস্ত। আর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সেসব এলাকার হাটবাজারেও বেচাবিক্রি বাড়ছে। এ ক্ষেত্রেও সচল হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সবকিছু মিলিয়ে এখন শহর ও গ্রামের বৈশাখের অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠছে। যতই দিন যাচ্ছে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে, বৈশাখী অর্থনীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এর পরিমাণ প্রতি বছরই বাড়ছে।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে যে লাখ লাখ হস্ত ও কারুশিল্পী এসব পেশার সঙ্গে জড়িত, বৈশাখী মেলা তাদের জন্য এক অমিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বর্তমানে এই কারুশিল্পীরা নিজেদের চেষ্টা ও উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন বৈশাখী মেলায় অংশ নিলেও সেখানে তারা অনেকটাই প্রান্তিক পর্যায়ের অংশগ্রহণকারী। জানা মতে, একমাত্র ঢাকায় বিসিক আয়োজিত বৈশাখী মেলাতেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কারুশিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এ সুযোগ দেশের সর্বত্র বিস্তৃত করা প্রয়োজন এবং এসব মেলায় এ কারুশিল্পীদেরই করে তোলা প্রয়োজন মূলধারার অংশগ্রহণকারী। সে ক্ষেত্রে বৈশাখী উৎসবকে তারা অনুসরণ করবেন না, বরং বৈশাখী উৎসবই তাদের অনুগামী হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী হস্ত ও কারুশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে বৈশাখী মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি উপযুক্ত পরিচর্যায় আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব কারুশিল্প উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিতে পারে। বাংলাদেশ থেকে এখন বছরে প্রায় ৮০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের হস্তশিল্প সামগ্রী বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

শেষ করতে চাই এ বলেই, আবহমানকাল থেকে বাঙালির চিরন্তন সার্বজনীন পার্বণ বাংলা নববর্ষ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আনন্দে উদ্বেল হয় নববর্ষের আহ্বানে। আমরা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন তথা পহেলা বৈশাখ শুরু করি বৈশাখী গান দিয়েই। বিশ্বের সব প্রান্তের সব বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে অতীত বছরের সব দুঃখ-গ্লানি।

 

"