বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

শামসুজ্জামান খান

বাঙালি সমাজের কৃষিসভ্যতার সূচনাকাল থেকেই বাংলা সনের উদ্ভবের সম্ভাবনা দেখা দেয়। সমাজ বিকাশের ধারায় সেভাবেই বাংলা সনের সৃষ্টি হয়েছে। তবে বাংলার ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এ সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষণা কেন করেননি সে একটা গুরুতর প্রশ্ন। তবে বাংলা সন ঠিক কখন, কীভাবে প্রচলিত হয়েছিল তা এখনো একেবারে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি। তবে নানা পরোক্ষ প্রমাণে মনে করা হয়Ñসম্রাট আকবর এই সন প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর যদি সরাসরি বাংলা সন প্রবর্তন না করে থাকেন, তবু এর প্রচলনে যে তার পরোক্ষ অবদান আছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ সম্রাট আকবর সর্বভারতীয় ইলাহিন সন প্রবর্তন করেছিলেন। বাংলা সন সেই ইলাহিন সনের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই প্রচলিত হয়েছে। সে জন্যই অধিকাংশ সন-গবেষক ও ঐতিহাসিক মনে করেন, বাংলা সন সম্রাট আকবর বা কোনো মুসলমান রাজা-বাদশা বা সামন্ত প্রভু প্রচলন করেছিলেন। এদের মধ্যে উড়িষ্যার বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাশিপ্রসাদ জয়সোয়াল মনে করেন আকবরই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রবর্তক। বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা মনে করেন, আকবরের তারিখ-ই-ইলাহি বা ইলাহি সন। হলো বঙ্গাব্দের মূলে। অন্যদিকে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেনও তার মিলেনিয়াম বক্তৃতায় (নয়াদিল্লি ২০ আগস্ট ১৯৯৮) সম্রাট আকবরকেই বাংলা সনের প্রবর্তক হিসেবে অভিহিত করেন। সন তারিখের ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করেছেন এমন একজন ধীমান গবেষক পলাশবরণ পাল বাংলা সনের নানা সমস্যা নিয়ে বিতর্ক করতে গিয়ে বলেছেন : কুড়ি পঁচিশ বছরের আগে বঙ্গাব্দ’ শব্দটার চল ছিল না, তখন বলা হতো শুধুই ‘সাল’ বা ‘সন। পশ্চিম ভারতে কেউ বিক্রম সংবৎকে ‘বিক্রম সাল’ বা ‘বিক্রম সন’ বলে না। নেপালে বুদ্ধ সংবৎকে কেউ বুদ্ধ সাল বলে না। তাহলে বাংলায় ‘সাল’ বা ‘সন’ বলা হয় কেন? এখানে মনে রাখতে হবে, সাল কথাটা ফার্সি, সন কথাটা আরবি। এ থেকে মনে হয়, হিজরি ক্যালেন্ডার থেকেই কোনোভাবে উদ্ভূত আমাদের বাংলা অব্দ বা বাংলা সাল। তা যদি হয়, তাহলে ‘আকবর থিয়োরি’র চেয়ে বিশ্বাস্য অন্য কোনো থিয়োরির সন্ধান পাওয়া মুশকিল (সাল তারিখের ইতিহাস-পলাশবরণ পাল, পৃ. ৯৫, সমতট প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৯৪)।

এক শ্রেণির গবেষক সপ্তম শতকের রাজা শশাঙ্ককে ‘বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলে দাবি করেন। আবার কেউ কেউ বাংলার সুলতানি আমলের বিখ্যাত স¤্রাট হোসেন শাহকে বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূতপূর্ব কারমাইকেল অধ্যাপক ও মধ্য এশিয়ান ইতিহাস-বিশেষজ্ঞ ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন : ...এটা পরিষ্কার যে আকবরের রাজত্বের পূর্বে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ ব্যবহারের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ও আলোচিত তথ্যাদি আকবরের আমলে চান্দ্র-হিজরি অব্দের সংস্কারের মধ্যেই বঙ্গাব্দের সূচনার ইঙ্গিত করে। এর বিপরীত কোনো ঘটনা নির্দেশক বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসূত্র আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত এই মতোই গ্রহণযোগ্য (বাঙ্গালা সন : বঙ্গ, বাঙ্গালা ও ভারত ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ৮৭, কলকাতা, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, ২০০০)।

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের উদ্ভবের বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও বাঙালির ইতিহাস ও তাদের জীবনযাত্রায় এ সনের প্রভাব ছিল ব্যাপক ও গভীর। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ বাংলাদেশে উৎপাদনমুখী সব কর্মকা-ে বাংলা সনের ছিল একমাত্র আধিপত্য। ভারতের নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বিকশিত কৃষি সভ্যতার সঙ্গে ঋতুভিত্তিক কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা ও তার হিসাব-নিকাশের সঙ্গে পঞ্জিকার সম্পর্ক নিবিড় ফসল বোনা, ফসলের সময়ভিত্তিক যতœ বা পরিচর্যা, ফসল কাটাসহ যাবতীয় কৃষিকাজ বাংলা সন, তারিখ পঞ্জিকা অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা হতো। সেই সঙ্গে ভালো ফসল ঘরে উঠলে বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণও উদযাপিত হতো বাংলা পঞ্জিকার দিনক্ষণ হিসাব করে। বাংলায় হরেক রকম মেলার দিন তারিখও নির্ধারিত ছিল বাংলা সনের সাথে-শুধু ফসল আর উৎসব না, বাঙালির অর্থাৎ বাঙালি কৃষকের পারিবারিক এবং সামাজিক কাজকর্ম, শুভাশুভ, বিবাহ, জনমৃত্যুসহ জীবনের সব বিষয়েই বাংলা সন ছিল একক ও অনন্য।

গ্রামীণ কৃষিসমাজের মানুষ বাংলা সন তারিখের যেমন হিসাব কষে জীবনযাত্রা নির্বাহ করত তার সঙ্গে চাঁদের হিসাবটাও ছিল মুখ্য। অমাবস্যা, পূর্ণিমা, সংক্রান্তি এবং তিথি-নক্ষত্রের ব্যাপারও তথাকথিত আধুনিক দৃষ্টিতে নিরক্ষর, কিন্তু জীবনের পাঠশালায় কঠোর প্রশিক্ষণে বুনো হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য ছিল দৈনন্দিন জীবনে দিকনির্দেশিকার মতো। বাঙালির ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনকেই শুধু বাংলা সন সবল ও সক্রিয় করেনি তার নিজস্ব ঘরোয়া ও সামাজিক জীবনবৃত্তের মধ্য থেকে তার বিশ্বদৃষ্টি গঠনেও বাংলা সননির্ভর সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে বৃহত্তর সমাজ, স্থানীয় সরকার, জমিদার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেও সহায়ক হয়েছে। ইংরেজ আমল থেকে প্রায়-একাল পর্যন্ত জমিদারের খাজনা দেওয়ার ব্যাপারে বাংলা সনই ছিল হিসাব-কিতাবের মাধ্যম। গ্রাম-বাংলার মৌলিক অর্থকরি, উৎপাদনমূলক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনাগত কার্যাদি এবং প্রজা ও জমিদার-সরকারের মধ্যে খাজনা, জমি কেনাবেচাসহ সব কাজ অর্থাৎ প্রজাসাধারণ ও জমিদার বা সরকারের মধ্যে আর্থিক, আইনগত ও প্রজ্ঞাপণমূলক কাজসমূহ বাংলা ভাষা ও বাংলা দিন তারিখকে প্রাধান্য দিয়ে সম্পন্ন করাই ছিল প্রথাসিদ্ধ নিয়ম।

বাঙালির কৃষিনির্ভর ওই জীবনে গ্রামীণ বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের ধারা ছিল খুবই শ্লথ। নদী-নালা, খাল-বিলের বিপুল বিস্তার, যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্গতি এবং নগদ পয়সার অভাবে জনজীবন ছিল স্তিমিত, মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাঢ্য বিরাজ করছিল। বাঙালির বাংলা সন যেমন ফসলি সন, তাদের জীবনেও ছিল ফসলের মৌসুমের উষ্ণতা, উচ্ছলতা। বর্ষাকালে ধান-পাট কাটা হলে তা বিক্রি করে যে নগদ পয়সা হাতে আসত তা দিয়েই বছরের নতুন কাপড় কেনা, খাজনার পাট চুকানোর পর ক’টা মাস অলস সময় কাটানো। শীতকালের আমন ধান ঘরে উঠলে আবার পিঠাপুলি খাওয়া, নবান্ন উৎসব, নানা রকম মেলার আয়োজন, যাত্রা, কবিগান, জারি-সারি, রামায়ণ, গম্ভীরা, কীর্তন, পালার আসর, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠিখেলা, মেয়েদের গার্সি উৎসব, সহেলা উৎসব, ছেলেদের দাড়িয়াবান্দা, গোল্লাছুট, বাণখেলা, হা-ডু-ডু, খেলার জমজমাট আনন্দ-ফুর্তি। এরপর বড়ো আকারের চৈত্রসংক্রান্তির মেলা এবং ১ বৈশাখের ভোরে কৃষক পরিবারের পারিবারিক ‘আমানি উৎসব’ যার লক্ষ্য সারা বছরের শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি এবং উৎকৃষ্ট ফলনের আকাক্সক্ষা। পরে সারাদিন ধরে হালখাতা উৎসব, নানা জায়গায় বড় ধরনের মেলা। তাতে সাংবাৎসরিক তৈজসপত্র, মৃৎশিল্প ও কারুপণ্যের বিকিকিনি। বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, পুতুল নাচ, সার্কাস, বক্স সিনেমার ‘তারপরেতে দেখেন ভালো’র স্থির চিত্রের প্রদর্শনী। এ নিয়েই গ্রামীণ মানুষের সেকি আনন্দ! পুঁতির মালা, আলতা, বাঁশি, কাঠ-বাঁশের খেলনা, কদমা হাওয়ার মিঠাই দিয়েই হাসি ও সুখের আভা ফোটানো যেত অল্পে তুষ্ট গ্রামীণ নারী ও শিশুর মুখে।

পাকিস্তান আমলে বাঙালি কৃষক জীবনের এই মৌলিক উৎসব পার্বণের বিষয়টিকে সরকারিভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ গ্রাম-বাংলার এই সংস্কৃতি ছিল সংকর সংস্কৃতি বা মিশ্র সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে হিন্দু, বৌদ্ধ, আদিবাসী এবং মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছিল। এই সমন্বিত সংস্কৃতিকে পাকিস্তানি শাসক এবং তাদের এ দেশীয় দোসর এবং নব-উথিত মুসলিম বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা অংশ সরকারি পর্যায়ে ও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং পাকিস্তানি তথা মুসলিম-আদর্শের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রচার চালাতে থাকে। এই প্রচার যে বিফলে গেছে, তা বলা যায় না। তৃণমূলপর্যায়ের অনেক লোক-উৎসব যেমন উপযোগী সামাজিক পটভূমি ও ফাংশন না থাকার জন্য বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে রয়েছে, তেমনি এ ধরনের বিরোধী প্রচারেও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলের বিখ্যাত ষাঁড়ের লড়াই, মুন্সীগঞ্জ-মানিকগঞ্জের গরুর দৌড়, কীর্তন, মেলা ও চড়ক উৎসব, হালখাতার সেই রীতি-নিষ্ঠার আবহ, ধূপধুনোময় পরিবেশ এখন খুব একটা দেখা যায় না। লক্ষ্মীদাতা গণেশের মূর্তিতে সিঁদুর, কাছে পিঠে তুলসীপাতা-হিন্দু দোকানেও এখন দুর্লক্ষ। আগে মুসলমান দোকানের হালখাতা উৎসবেও সমন্বিত ঐতিহ্যের যে ছাপ পড়ত বাংলাদেশের সামাজিক জীবনে ইসলামীকরণের এই যুগে তা আর চোখে পড়ে না।

বাংলা সন ও বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির অবস্থান বর্তমান বাংলাদেশ আর আগের মতো নেই। এখন কৃষক পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া শিখছে। গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যে নানা উপাদান যুক্ত হয়ে নতুন গতিবেগ সঞ্চার হয়েছে এবং এতে অনেকের অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে, হাতে নগদ পয়সা আসার উৎস সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জীবনধারার পরিবর্তন ঘটেছে, বদলেছে ঘরবাড়ির ধরন, আসবাবপত্র, তৈজসপত্র এবং সামাজিক রীতিনীতি ও অভ্যাসের। এই পরিবর্তনের ফলে বাঙালির ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির উপাদান এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বাংলা সনও আর এখন একাধিপত্য করতে পারছে না। এদের সন্তানাদি এখন গ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য যে কাজই করুক না কেন তার সঙ্গে বাংলা সনের সম্পর্ক আগের মতো ওতপ্রোত নয়। বরং গ্রাম-জীবনের নতুন ধারা বা শহরের বাস বা বিদেশে চাকরি-বাকরির সুবাদে এদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন হিসেবে রোমান সনের ব্যবহার বেড়েছে-বাংলা সন হয়তো গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে সাবেক কালের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত গৃহকর্ত্রীর কাছে। গ্রাম-বাংলার ব্যাপকসংখ্যক স্কুল-কলেজ-মাদরাসা চালু হওয়ায় জীবনধারার নানা পরিবর্তন এসেছে। বিদেশি শব্দ, পাশ্চাত্য জীবনধারার নানা উপকরণ, জিন্সের প্যান্ট এবং কোকাকোলা ঢুকে গেছে গ্রামে। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, অসংখ্য দোকানপাট, ঢাকার জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্র, বাস-ট্যাক্সি-অটোরিকশা, ভিডিও ফিল্ম, হিন্দি সিনেমা ইত্যাদির ব্যাপক প্রভাবে আগের কালের সংস্কৃতি অনিকেত ও উনুল হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলা সনও বাঙালি সংস্কৃতি প্রচ- চাপের মধ্যে পড়েছে। এখন আর আগের মতো বাংলা দেয়াল পঞ্জিকা দেখা যায় না। ক্বচিৎ কখনো কৃষি ব্যাংকের পঞ্জিকায় রোমান ক্যালেন্ডারের অক্ষরের নিচে বাংলা সংখ্যাও লেখা থাকে। আসলে গ্রাম-বাংলা এখন এক ক্রান্তিকালের মুখে। পুরোনো সংস্কৃতি ও জীবনধারা ভেঙে গেছে, কিন্তু নতুন সংস্কৃতিরও বুনিয়াদ পাকা হয়নি।

ওপরে আমরা ঐতিহ্যগত বাংলা সংস্কৃতির ধারার রূপান্তরের একটা চিত্র উপস্থাপন করেছি। ওই ধারাটি যেখানে এসে পৌঁছেছে তাতে, তেমনি কোনো ইতিবাচক ও জীবনমুখী সুস্থ সমন্বয় আমরা দেখি না। বরং বলা যায় এক ধরনের ধুমধাড়াক্কাপ্রবণ বিনোদনশৈলী গ্রাম-বাংলাতেও পল্লবিত হয়ে উঠছে। তবে আশার কথা হলো ঐতিহ্য ও লোকজ বিষয়-আসয়ের একটা রীতি এই যে সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তা নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়Ñনতুন বা ভিন্নরূপে তা নিজেকে বিন্যস্ত করে এবং এর আর একটি বিকাশ বা নবনির্মাণের ধারার মধ্যে এক ধরনের চক্রমণ পদ্ধতি কাজ করে। নগর থেকে শুরু হয়ে কোনো শিল্পরীতি গ্রাম-বাংলার লোকজরীতিতে বিন্যস্ত হতে পারে। আমার গ্রামীণ কোনো ভাব, লোকজ শিল্পধারা শহরে এসে জাতীয় সংস্কৃতির নবনির্মাণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সংস্কৃতি-তা লোকজই হোক, আর নাগরিক দৃষ্টিতে মানসম্পন্নই হোকÑতার বিবর্তন বা রূপান্তর ঘটে; তাই ‘আবহমানকালের’ সংস্কৃতি বলে। কিছু নেই। ফলে লোকজ সংস্কৃতির সমৃদ্ধির ধারাকে সব সময়ে স্থিতাবস্থায় ধরে রাখা বা পাওয়া সম্ভব না।

বাংলা সন ও বাংলা বর্ষের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি কীভাবে ঘটেছে আমরা সেদিকে নজর দিতে পারি। পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক এ কথা বলেও পাক শাসকদের মন ভোলানো যায়নি। (স্মর্তব্য, পাক আমলে নির্মিত ঢাকার মোহাম্মদপুরের নানা রাস্তার নাম প্রধানত মোঘল স¤্রাটদের নামে করা হলেও আকবরের নামে কোনো রাস্তার নাম নেই। কারণ তিনি পাকি শাসকদের ‘না-পছন্দ’ মিলিত সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন)। তবে তখন বাংলা সন ও নববর্ষের উৎসব বাঙালিদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় তা এক নতুন জাতীয় রূপ ও গভীর তাৎপর্য লাভ করেছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ফলে বাঙালির যে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ ও নৃ-তাত্ত্বিক জাতীয় আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে বাংলা সন, বাংলা নববর্ষ উৎসব ও তার আনুষঙ্গিক উপাদানসমূহ তাতে নতুন গতিবেগ সৃষ্টি করে।

১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিশাল বিজয় এই নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদ জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেটে জনসমর্থন ও রাজনৈতিক বৈধতা লাভ করে। পূর্ব বাংলার নবজাগ্রত নগরবাসী বাঙালি মুসলমান সমাজ নিজস্ব জনসমর্থন ও রাজনৈতিক বৈধতা লাভ করে। পূর্ব বাংলার নবজাগ্রত নগরবাসী বাঙালি মুসলমান সমাজ নিজস্ব স্বাদেশিক ঐতিহ্য অনুসরণের উদ্দেশ্যে এবং বাঙালি জাতিগঠন ও জাতীয়তাবাদের বিকাশে বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখকে সামনে আনে। ফলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে বাঙালির এক প্রাণের উৎসবের দিন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে এমন একটি ধর্ম-নিরপেক্ষ সর্বজনীন মহান জাতীয় উৎসব দিনের তখন তীব্র প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল।

গ্রাম-বাংলার মূল উৎপাদন ব্যবস্থাও তার সহযোগী কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের এক লোকজ উৎসব এভাবেই জাতীয় বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে এবং জাতীয় সংস্কৃতির মুক্তধারা সৃষ্টির এক প্রতিবাদী উৎসবেরও রূপ লাভ করে। বৈশাখের এই নাগরিক উত্থান এবং সর্বজনীন জাতীয় উৎসবের রূপ নির্মাণে অনুঘটকের কাজটি করে ছায়ানট নামের সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। এদেরই প্রয়াসে বাংলা নববর্ষ এখন শুধু বিশাল সর্বজনীন জাতীয় উৎসবই নয়, রাজনৈতিক ভ-ামি ও শঠতার বিরুদ্ধে এক মোক্ষম প্রতিবাদের উৎসবও। এই উৎসবে ১৯৮৯ থেকে। অন্তর্ভুক্ত ঢাকার চারুকলার ছাত্রদের লোকজ বিশ্বাসের নানা মোটিভমুক্ত মুখোশ ইত্যাদি সহযোগে মিহি গ্রাম-বাংলার লোক মিছিলের (মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থানার সহরইল গ্রামের সিদ্ধা বাড়ির প্রাচীন মেলায় এমন মিছিল বের হতো) মুখোশকে যে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয় তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা নববর্ষের এই নতুন সম্ভাবনার জন্যই ধর্ম ব্যবসায়ী ও মূঢ় মোল্লারা রমনার বটমূলে এই উৎসবে যে বোমা হামলা করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

"