ফুলগাজীতে ‘চিহ্নিত রাজাকার’কে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি!

প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০

জামাল উদ্দিন, ফুলগাজী (ফেনী)

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলায় ‘চিহ্নিত রাজাকার’ সিরাজুল হক মিয়াজীকে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বানানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন দফতরে এ অভিযোগ দেন। অভিযোগ আছে, এ ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের ডেপুটি কমান্ডার ও স্থানীয় এমপির প্রতিনিধি কাজী আবদুর রহিম প্রভাব বিস্তার করেন। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের সময় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত সিরাজুল হক মিয়াজী উপজেলার ফুলগাজী ইউনিয়নের মৃত জমির উদ্দিনের ছেলে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজুল হক মিয়াজীর বর্তমান ঠিকানা উপজেলার ফুলগাজী ইউনিয়নের উত্তর শ্রীপুর গ্রামে। কিন্তু তিনি এর আগে আনন্দপুর ইউনিয়নের তাল পুকুরিয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। এলাকাবাসী সূত্রে ও স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের দেওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালীন পাক হানাদার বাহিনীদের সহযোগিতা করার কারণে দেশ স্বাধীনের পর গ্রামবাসী এবং মুক্তিযোদ্ধারা মিলে তাকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করে। পরবর্তীতে সে বর্তমান ঠিকানা এসে বসবাস করে। এ ঘটনার পর ফুলগাজী সদর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল আলিমের লিখিত সুপারিশের মাধ্যমে ফুলগাজী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বাদী হয়ে জাতীয় স্কাউট ভবন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব বরাবর অভিযোগ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ বেশ কয়েকজনের স্বাক্ষর এবং স্থানীয় তিন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল্লাহ বাহার (সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার অব., সামরিক গেজেট ২১২৮), হোনা মিয়া (লাল বই নং-০২১১০৬০০৫৯) এবং সদর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ধন মিয়াকে (লাল বই নং-০২১১০৬০০৪৯) সাক্ষী নিয়েছেন। অভিযোগপত্রে সাক্ষ্যদানকারী মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল্লাহ বাহার, হোনা মিয়া এবং সদর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ধন মিয়া জানান, এই সিরাজুল হক মিয়াজী যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তি বাহিনীদের ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নারীদের ধর্ষণসহ নানা অপকর্ম তিনি করেছেন। কিন্তু কীভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হলেন, তা সত্যি অবাক করার মতো বিষয়। এখনো তার অত্যাচারের কথা শুনলে ভুক্তভোগীদের চোখের পানি ঝর ঝর করে পড়তে থাকে এবং গা শিউরে ওঠে। তিনি ৪নং আনন্দপুর ইউনিয়ন থেকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত এবং বিতাড়িত হয়ে বর্তমানে স্থানে পাড়ি জমান। তার এই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার খবর শুনে এলাকাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে ফুলগাজী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল বশরের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় আমরা কখনো তাকে যুদ্ধ করতে দেখিনি। কিন্তু আমাদের ডেপুটি কমান্ডার ও স্থানীয় এমপির প্রতিনিধি কাজী আবদুর রহিম প্রভাব বিস্তার করে সিরাজুল হক মিয়াজী তার সঙ্গে যুদ্ধ করছে বলে যাচাই-বাছাইয়ের কমিটির কাছে লিখিত দিয়ে চিহ্নিত রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করেন। আমরা চাই সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই রাজাকারের সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানাচ্ছি।

এ ব্যাপারে সিরাজুল হক মিয়াজীর উত্তর শ্রীপুর গ্রামের বাড়ি গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর চাইলে তিনি কোনো ফোন ব্যবহার করেন না বলে জানানো হয়।

ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিসিঞ্জার চাকমার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমরা যাচাই-বাছায়ের কমিটির মাত্র সদস্য ছিলাম। কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি লিখিতভাবে বলে যে, সে আমার সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তাহলে আমার করণীয় কিছুই নেই।’ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অভিযোগপত্র দেওয়া প্রসঙ্গটি শুনেছেন বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে থেকে কোনো চিঠি আসলে, আমরা তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেব।’

"