প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ হচ্ছে ‘ইয়াবা গ্রামে’

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

আরফাতুল মজিদ, কক্সবাজার

কক্সবাজার বাস টার্মিনাল-কলাতলী বাইপাশ সড়কসংলগ্ন ৫০ একরের বিশাল পাহাড়কে চারদিক থেকে গিলে খাচ্ছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র। প্রশাসন ও স্থানীয়দের মধ্যে ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ লারপাড়া এলাকাটি ঝিলংজা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত পাহাড়টি কেটে তৈরি হয়েছে চারপাশের চার শতাধিক ঘরবাড়ি। সরকারি ১নং খাস খতিয়ানের অধিভুক্ত এই এলাকায় বসবাসকারী অধিকাংশের বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। এই ইয়াবা ব্যবসায়ী চক্রটি পাহাড় কেটে সেখানে নির্মাণ করছেন একের পর এক ভবন।

অনেকে পাহাড় কেটে পাদদেশে ও ঢালুতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বহুতল ভবনও নির্মাণ করছেন। ইতোমধ্যে অনেক ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অনেকগুলো চলমান। দক্ষিণ লারপাড়া পাহাড়ের পশ্চিম পাশে পাহাড়ের নিচে একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ওই নির্মাণাধীন ভবনের মালিক নুরুল মোস্তফা নামে এক যুবক। তার পিতার নাম মনসুর আলম। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, নুরুল মোস্তফা পাহাড় কেটে সেখানে বিশাল জমি বের করেছেন। ইতোমধ্যে ৩০ শতকের মতো জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। পরিবেশ ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে কোনো দফতরের অনুমতি ছাড়াই ভবনের কাজ করছেন তিনি।

জানা গেছে, নুরুল মোস্তফার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দুবার তিনি ইয়াবা নিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ওই সময় দীর্ঘদিন কারাভোগও করতে হয়। বর্তমানেও নুরুল মোস্তফা একটি ইয়াবা মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসন ও স্থানীয়দের কাছে দক্ষিণ লারপাড়া ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। সেখানকার বেশির ভাগ মানুষই ইয়াবা ব্যবসা ও পাচারে জড়িত। পুরো লারপাড়ায় দুইশ মানুষ মরণনেশা ইয়াবার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আর রাতারাতি কোটিপতি বনে পাহাড় কেটে তৈরি করছেন একের পর এক বিল্ডিং।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ লারপাড়া এলাকায় প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। পশ্চিম পাশের সড়ক দিয়ে ঢুকতেই পাহাড়ের ঢালুতে পর পর চারটি একতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও ওই বাড়ির মালিকরা কথা বলতে চাননি। স্থানীয়রাও তাদের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ওই পথ দিয়ে আর একটু ঢুকতেই চোখে পড়ে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি ভবন। এটিও একই পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে। ওই ভবনের নিচে তিনটি দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

একটি দোকানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৮ থেকে ৯ মাস আগে ভবনটি নির্মাণ করেছেন মোহছেনা আক্তার নামে এক নারী। তার স্বামী বিদেশে বলে শোনেছি। তারা এর আগে সদর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় বসবাস করত। তিনি ওই জায়গাটি সরকারি খাস বলে দাবি করেন। পরে ওই ভবনের মালিক মোহছেনা আক্তারের সাথে কথা বলতে চাইলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

ওই পাহাড়ের পূর্বপাশে পাহাড় কেটে মার্কেট ও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি ও তার আত্মীয়স্বজনেরা দালানকোটাও নির্মাণ করেছেন।

স্থানীয়রা জানান, বিশাল পাহাড়টিতে পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণ করেছেন ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে নুরুল মোস্তফা, দেলোয়ার হোসেন ও জালাল আহমেদসহ দুই শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ী।

স্থানীয় মোহাম্মদ আবুল কাশেম নামে এক ব্যক্তি বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে পাহাড়টি দিন দিন দখল হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব বিস্তার করে পাহাড় কেটে বাড়িঘর নির্মাণ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না। তারা সরকারি জমি দখল ছাড়াও নানা ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িত রয়েছে।

সদর উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝিলংজা মৌজার ১নং খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত পাহাড়টি। বিভিন্ন সময়ে ভূমিদস্যুরা পাহাড়টি দখল করেছেন।

সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পঙ্কজ বড়–য়া বলেন, এগুলো সরকারি জমি। দখলদারেরা অবৈধভাবে পাহাড়ের জমিগুলো দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন। বিক্রি করছেন বলেও শুনেছি। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সরকারি জমি দখলমুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি। পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. মুমিনুল ইসলাম বলেন, যারা পাহাড় কেটে বাড়ি করেছেন এবং বর্তমানেও পাহাড় কাটছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

"