বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণ মৎস্যঘের

কমছে খাদ্যশস্যের নিবিড়তা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

কেশবপুর (যশোর) প্রতিনিধি

জলাবদ্ধ ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরকারী খাল দখল এবং ছয় হাজার মৎস্য ঘের তৈরি করায় যশোরের কেশবপুরে এবারো ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। মৎস্য ঘের করার কারণে যেমন শস্য নিবিড়তা কমে যাচ্ছে তেমনি ঘের মালিকরা সরকারী রাস্তা ব্যবহার করে তা করে দিচ্ছে নষ্ট। পাশাপাশি হারির টাকা না দেয়া, সময়মত সেচ না দেয়ায় ফসল উৎপাদন করতে না পেরে জমির মালিক কৃষকের সঙ্গে ঘের মালিকদের দ্বন্দ্ব কলহ এমনকি মামলা হামলা লেগেই আছে।

জলাবদ্ধ ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যশোরের কেশবপুরের বিভিন্ন বিলে ৭ হাজার ৫ শ’ হেক্টর জমি লীজ নিয়ে ৬ হাজার ১১৭টি মাছের ঘের তৈরী করেছে। এর পাশাপাশি তারা বিভিন্ন বিলে থাকা ২৫টি ছোট বড় সরকারী খালও দখল করে মাছের ঘেরের মধ্যে নিয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে মাছের ঘের করা এবং খাল দখল করার কারণে বর্ষা মৌসুমে অতি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে ভয়াবহ বন্যা বা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। একই কারণে গত বছরও ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বন্যায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে এবং বাড়ি ঘর ছেড়ে ১০ হাজার মানুষ উঁচু স্থান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সড়কের পাশ টং ঘর বেঁধে আশ্রয় নিয়েছিল। সরকারী রাস্তা হতে তিন থেকে পাঁচ ফুট দূরত্বে বেড়ি নির্মাণ করে মাছের ঘের করার নিয়ম থাকলেও এখানকার কোন ঘের মালিক তা না মেনে তারা সরকারী রাস্তা ঘেরের বেড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কারণে পানির ঢেউয়ে রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। অধিকাংশ ঘের মালিক রাস্তার উপর চার পাঁচ ফুট উঁচু করে বেড়ি নির্মাণ করার কারণে মানুষ ও যান চলাচলের মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

উৎপাদিত ফসলের চেয়েও বেশী লাভ দেখিয়ে পাঁচ বছরের জন্য কৃষকের কাছ থেকে জমি লীজ নিয়ে মাছের ঘের করলেও সময়মত কৃষকের হারির টাকা না দেয়া, ঘেরের পানি নিষ্কাশন করে ফসল উৎপাদন করতে না দেয়ায় জমির মালিক কৃষকের সঙ্গে ঘের মালিকদের দ্বন্দ্ব কলহ এমনকি মামলা হামলা লেগেই আছে। কৃষকের পক্ষ থেকে এ বছর এ ধরণের শতাধিক অভিযোগ কেশবপুর উপজেলা কৃষি ও মৎস্য দপ্তরে দেয়া হয়েছে। মাছের ঘের হওয়ার কারণে কেশবপুরে শস্যের নিবিড়তা কমে এখন ১৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

কেশবপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মহাদেব চন্দ্র সানা বলেন, কেশবপুর কৃষি সমৃদ্ধ একটি উপজেলা। তিন চার বছর আগে এখানকার শস্য নিবিড়তা ছিল তিন শ’র কাছাকাছি। ৬ হাজারেরও বেশি হেক্টর জমিতে মাছের ঘের হওয়ায় শস্য নিবিড়তা কমে এসেছে ১৯৭ শতাংশে। অতি লাভের আশায় মৎস্য ব্যবসায়িরা তিন ফসলী জমিতে ঘের করছে আর ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক। অপরিকল্পিতভাবে ঘের করার কারনে গত বছর ভয়াবহ বন্যা হয়। যে কারনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘের না করার উদ্যোগ নেয়া হয় তারপরও বেশি লাভের আশায় এসব ঘের করা হয়েছে।

উপজেলা মৎস্য অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আলমগীর কবীর জানান, কেশবপুরে ৭ হাজার ৫ শ’ হেক্টর জমিতে ৬ হাজার ১১৭টি মাছের ঘের আছে। ঘের হওয়ার কারনে মাছের উৎপাদন ও মানুষের কর্মসংস্থান বাড়লেও ধ্বংস হচ্ছে এলাকার রাস্তাঘাট। ২১টি সরকারী খাল আছে যা দখল হয়ে গেছে। উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) জানানো হয়েছে। তিনি সার্ভেয়ার দিয়ে জরীপ করছেন। খালগুলি উদ্ধার হলে জলাবদ্ধতা দূরীকরণ হবে। মৎস্য ঘের মালিকরা অপরিকল্পিতভাবে পাঁচ বছরের জন্য মাছের ঘের করছে। তিন বছর পর তারা জমির মালিকদের হারির টাকা ও ঘেরের পানি নিষ্কাশন করছে না বলে কৃষক জমিতে ধান লাগাতে পারছে না। যে কারণে তাদের মধ্যে কলহ বিবাদ লেগেই আছে। ঘের মালিকরা এক শ’ টাকার ষ্ট্যা¤েপ চুক্তিপত্র করে এসব ঘের করেছে। যদি রেজিষ্ট্রি করে ঘের করতো তা হলে এই সমস্যা থাকতো না। জমির মালিকরা পরিত্রান পেত।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, কেশবপুরের হরিহর ও আপার ভদ্রা নদী খনন কাজ শুরু হয়েছে। নদ নদী খননের পাশাপাশি অপরিকল্পিত ঘের উচ্ছেদ এবং দখলকৃত খাল দখলমুক্ত করা সম্ভব হলে কেশবপুরে জলাবদ্ধতা দেখা দেবেনা।

উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. কবীর হোসেন বলেন, ইতিমধ্যেই কেশবপুরকে জলাবদ্ধতা মুক্ত রাখতে পানি প্রবাহে বাঁধা সৃষ্টিকারী বিভিন্ন নদ নদী থেকে মাছ শিকারীদের দেয়া পাটাসহ অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিল অভ্যন্তরে যে সমস্ত সরকারী খাল রয়েছে তা চিহ্নিত করে পানি প্রবাহে যাতে কোন বাঁধা না হয় সে লক্ষ্যেও কাজ করা হচ্ছে।

"