সাতক্ষীরা জেলা কারাগার

কারাগার নয়, সংশোধনাগার

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

আকরামুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

সারা দেশের মডেল হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা জেলা কারাগার। এটা শুধু এখন আর কয়েদিদের বন্দিশালা নয় বরং সংশোধনাগার। ২০১৬ সালে সারা দেশের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কারাগার হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে কারাগারটি। এখানে বন্দিদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণসহ তাদের আন্তরিকতার সঙ্গে পুনর্বাসনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলের ভেতরে বন্দিরা হাতের কাজ করেন। উদ্বুদ্ধ করা হয় কারিগরি প্রশিক্ষণের। আর এর মাধ্যমে উপার্জন করেন টাকা। নিজের কাছে কিছু রাখেন আর বাড়িতে এসব উপার্জিত টাকা পাঠিয়ে দেন বাড়িতে বন্দিরা। অনেকে আবার জেল থেকে বেরিয়ে কারাগার থেকে নেওয়া প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। ব্যতিক্রমী এ জেলা কারাগারের উদ্যোগে এখন উদ্বুদ্ধ হয়েছেন বন্দিরাও।

জানা যায়, হাতে তৈরি করা হয় পুঁতি দিয়ে ব্যাগ। ব্যাগটির সৌন্দর্য এতটাই যে কেউ দেখলেই পছন্দ করবেন। কিনতে চাইবেন। কারাগার কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় এগুলো বাইরে বিক্রি করা হয়। বিক্রির থেকে লাভের কিছু অংশ দেওয়া হয় বন্দি কারিগরদের। বাকিটা জেলা কারাগারের তহবিলে জমা করা হয়। শেখান হয় ধর্মীয় অনুশাসন।

নাম না প্রকাশ করে এক বন্দি জানান, আমি হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছি। আমি এখন বুঝতে পারছি জীবন কতটা সুন্দর। আমি ভুল করে অপরাধ করেছিলাম। তবে এখন আর সংশোধনের উপায় নেই। আমার বিচার হয়েছে। সাজা হয়েছে। আগে যশোর কারাগারে ছিলাম সেখান থেকে এখন সাতক্ষীরা কারাগারে রয়েছি। এখানে এসে হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে কারাগারের ভেতরেই পুঁতির ব্যাগ তৈরি করি। কাজ করে আমি এক লাখ টাকা রোজগার করেছি। ৫০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। বাকি ৫০ হাজার টাকা আমার পিসি কার্ডে রয়েছে।

তা ছাড়া কারাভ্যন্তরে তৈরি করা হয় চটের ব্যাগ। ব্যাগগুলো বাইরে বিক্রি করা না হলেও কারাগারে আটক থাকা বন্দিদের জন্য স্বজনরা যেসব খাবার পাঠায় সেসব খাবার বহনের কাজে ব্যবহার করা হয়। দাম রাখা হয় ১০ টাকা। আর পুঁতির তৈরি হাত ব্যাগের বিভিন্ন ধরনের মূল্য রয়েছে।

চটের ব্যাগ তৈরির কাজে নিয়োজিত এক বন্দি বলেন, মাদক মামলায় জেলখানায় রয়েছি। এখানে বসে না থেকে কাজ করি। টাকাও রোজগার হয়। বাড়িয়ে পাঠিয়ে দেই টাকাগুলো। কিছু টাকা নিজের জন্য রাখি। জেলখানা থেকে বাইরে গিয়ে আমি এখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া বিষয়টি কাজে লাগিয়ে নিজে একটি দোকান করব।

জেলা কারাগারের জেলার তুহিন কান্তি খান জানান, কারা পরিদর্শক কারাগারকে একটি সংশোধনাগারে রূপান্তরিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জেলা সুপারের আন্তরিকতায় আমরা জেলা কারাগারটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বন্দিদের সংশোধনের জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। বন্দিরাও বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন। সহযোগিতা করছেন। পাটের কাজ, পুঁতির কাজ, টুপি তৈরির কাজ ইত্যাদি আমরা করছি। তাদেরকে কারাগারে বসিয়ে না রেখে কিভাবে কাজের মধ্য দিয়ে সংশোধন করা যায় আমরা সেগুলোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বন্দিদের সমাজে পুনর্বাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপে কথা জানিয়ে জেলা সুপার মো. আবু জায়েদ বলেন, ইলেকট্রিক প্রশিক্ষণ, চটের ব্যাগের প্রশিক্ষণ, পুঁতির ব্যাগ তৈরির প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যেন এসব বন্দিরা কারাগার থেকে বাইরে গিয়ে সমাজে কিছু করে খেতে পারে, প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ জন্য আমরা এ কার্যক্রমগুলো হাতে নিয়েছি। তিনি আরো বলেন, বন্দিদের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র আমরা বাইরে বিক্রি করি। বিক্রির সিংহভাগ অর্থই বন্দিদের দিয়ে দেওয়া হয়। আরো কিছু পদেক্ষেপ গ্রহণের জন্য আইজিকে লেখা হয়েছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব। এখান থেকে শিখে যদি কোনো ব্যক্তি সমাজে গিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে তবেই আমাদের এ উদ্যোগ সফল হবে। তবে ইতোমধ্যে কয়েকজন বন্দি বাইরে গিয়ে পুঁতির ব্যাগের দোকান দিয়েছেন। কেউ চটের ব্যাগের দোকান দিয়েছেন। এটা আমাদের সফলতা যে, আমরা বন্দিদের পূনবাসিত করতে পেরেছি। সমাজের বিত্তবানরা যদি এসব মানুষদের কিছু সহযোগিতা করে তবে তারা সমাজে আরো ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।

"