নিম্নমানের নপলি দিয়ে পোনা ক্ষতির আশঙ্কায় চিংড়িচাষিরা

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ০০:০০

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি

পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে অবৈধভাবে আনা জীবাণুযুক্ত নপলি দিয়ে চিংড়ি পোনা উৎপাদন ও সরবরাহের কারণে চিংড়িশিল্প ধ্বংসের আশঙ্কায় শঙ্কিত উপকূলীয় চিংড়িচাষিরা। ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন, বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ও চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ থাকার সুযোগে কতিপয় ব্যক্তি ও হ্যাচারি মালিক অবৈধভাবে জীবাণুযুক্ত নপলি দিয়ে পোনা উৎপাদন করে বিভিন্ন ঘেরে সরবরাহ করেছেন। এই নিম্নমানের পোনা ঘেরে ছাড়ার কারণে দেখা দিচ্ছে ভাইরাসসহ নতুন নতুন রোগবালাই। এর ফলে আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করেও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চিংড়িচাষিরা। এ বিরুদ্ধে প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে তৎপর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শ্রিম্প হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (সেব)।

জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে এখন প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমিতে প্রতিবছর চিংড়ি চাষ হয়ে থাকে। আশির দশকেই চিংড়ি চাষ লাভজনক হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উপকূলীয় এলাকার সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে লবণ-পানির চিংড়ি চাষ ব্যবস্থাপনা। শুরুতে প্রাকৃতিক উৎস থেকেই পোনার চাহিদা পূরণ হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ঘেরের সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশগত নানা কারণে প্রাকৃতিক উৎসে পোনার প্রাপ্তিতা হ্রাস পাওয়ায় কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তিতে পোনা উৎপাদনে ঝুঁকে পড়ে হ্যাচারিগুলো। তবে পোনার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দীর্ঘদিন। বিশেষ করে ১৯৯৫ সালের দিকে থাইল্যান্ড থেকে পোনা আমদানি করার পর চিংড়িতে হোয়াইট স্পর্টসহ (ভাইরাস) বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দেয়।

নিম্নমানের পোনা ব্যবহার করে টানা কয়েক বছর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চিংড়িচাষিরা। এরপর থেকে মানসম্মত পোনার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। এদিকে ৬৫ দিন বঙ্গপোসাগরে মাছসহ চিংড়ি আহরণ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় দেশের সব হ্যাচারিতে চিংড়ি পোনা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে উপকূলীয় এলাকার কতিপয় ব্যক্তি ও হ্যাচারি মালিক পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নিম্নমানের জীবাণুযুক্ত নপলি এনে পোনা উৎপাদন করে স্থানীয় বিভিন্ন ঘেরে সরবরাহ করছেন। এতে ভাইরাসসহ নতুন নতুন রোগবালাইয়ের আশঙ্কা করেছেন হ্যাচারি অ্যাসোসিয়েশন ও ঘের মালিকরা। খুলনা বিভাগীয় চিংড়ি পোনা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া রিপন, ঘের মালিক আলহাজ মাসফিয়ার রহমান সবুজ জানান, যে সময়টায় সরকার চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ করেছে, এই সময়টাই ঘের মালিকদের প্রচুর পরিমাণে পোনার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে শুধু পাইকগাছা-কয়রার জন্য প্রতিদিন এক কোটি পোনার চাহিদা রয়েছে। চাহিদার ৯০ ভাগ পোনা আসে কক্সবাজারের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার ফলে এ সময়ে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি পার্শ¦বর্তী দেশ থেকে নিম্নমানের নপলি এনে পোনা উৎপাদন করে সরবরাহ করে থাকে। এর ফলে নেকচাষি আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করলেও ভাইরাসসহ

বিভিন্ন রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়ে চিংড়ি মারা যায়। এতে করে দেশের সম্ভাবনাময় চিংড়িশিল্প আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। চিংড়িশিল্পকে বাঁচাতে হলে নিম্নমানের পোনা উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করতে হবে।

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পবিত্র কুমার দাশ জানান, ২০১৫ সালের ২০ মে সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন বঙ্গোপসাগরে মাছ ও চিংড়ি আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাইকগাছাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় কয়েকটি হ্যাচারি রয়েছে এদের কোনোটার নিবন্ধন নেই। তবে নিষেধাজ্ঞা এ সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে নিম্নমানের পোনা উৎপাদন করতে না পারে এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিং করা হবে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফকরুল হাসান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণাকেন্দ্রের

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. খান কামাল জানান, নিষেধাজ্ঞা সময়ের মধ্যে কোথাও নিম্নমানের নপলি দিয়ে পোনা উৎপাদন করা হয় এবং এ ধরনের নপলি কোন পথে, কিভাবে আসে-এ বিষয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণাদি নেই।

অনুরূপভাবে কোথাও কোথাও শুনেছি, ভ্যানামির চাষ হয়। অথচ ভ্যানামির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ডিজিজ ও ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে থাকে। এ ধরনের পোনা উৎপাদন বন্ধ কিংবা এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নতুন নতুন রোগবালাইয়ের আবির্ভাব ঘটবে। এতে ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়বে দেশের সম্ভাবনাময় চিংড়ি খাত।

"