মানবসেবায় নিয়োজিত এক তরুণপ্রাণ প্রতিবন্ধী

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৭, ০০:০০

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি

নিজে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়ন নিয়ে স্বপ্ন আঁকছেন লালমনিরহাট শহরের বিডিআরহাট এলাকার মাসুম পারভেজ। ইতোমধ্যে তিনি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সুদের চাপে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে তার সেই স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন।

মাসুম পারভেজ জানান, তিনি লালমনিরহাট শহরের বিডিআরহাট এলাকার সাবেক কাউন্সিলর মো. মোক্তার হোসেনের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। জন্ম ১৯৮২ সালে ৫ মে। জন্মের ছয় মাস পর থেকে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে স্কুলে ভর্তি হয়েও পড়াশোনা থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় পড়াশোনা করতে না পারলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোবল হারাননি। ডান পা অক্ষম তাই, ক্র্যাচের ওপর ভর করেই চলতে হয় তাকে। শারীরিক প্রতিবন্ধী মাসুম পারভেজ শারীরিক প্রতিবন্ধীর প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি, পারেনি সমাজের বোঝা করে রাখতে। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রাম করে প্রতিবন্ধীর সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। ১৯৯৬ সালে বাবার সঙ্গে সার কীটনাশকের ব্যবসায় মনোযোগী হন। মাত্র ৩৮ হাজার টাকার সার কীটনাশক আর বাবার নামে সার ডিলারশিপ লাইসেন্স নিয়ে একটি টিনশেড ঘরে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবসায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। কয়েক বছর পর যুক্ত করেন সিমেন্ট ও পরিবহনের ব্যবসা। আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিকে টিনশেড ঘর থেকে তিনতলাবিশিষ্ট বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেন। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে আজ তিনি কোটি টাকার ব্যবসায়ী হয়েছেন। সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পাশাপাশি তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন বিভিন্ন সমাজসেবা ও কল্যাণমূলক নানান কাজে অথচ তিনি নিজেও একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। সামাজিক কাজের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিনোদনেও রয়েছে তার নিবিড় সম্পর্ক। সাধ্যমতো সহযোগিতা করে আসছেন প্রতিবন্ধী ও অনাথ শিশুদের। সমাজের হতদরিদ্র মানুষজনকে দিচ্ছেন সহযোগিতা।

মাসুম পারভেজ বলেন, ‘আমি ব্যাংক থেকে কোনো সুযোগ পাচ্ছি না। আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ী, আমার প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কিছু স্বপ্ন রয়েছে, হোক না সে শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী, আমি প্রথমত এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে চাই। তারা যেন সমাজের ৮-১০ জনের মতোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন। সমাজের কাছে উপহাস অথবা ঘৃণার পাত্র হয়ে বাঁচতে না হয়। কারণ তারাও এই সমাজের কারো ভাই-বোন-পিতা-মাতা। আমরা প্রতিবন্ধী হলেও আমাদের স্বপ্ন আছে। ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি।’

২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় তালুক খুটামারা মোক্তারটারী এলাকায় গড়ে তুলেছেন মাসুদ রানা হাফেজিয়া মাদরাসা। সেই মাদরাসায় বর্তমানে ২৯ জন অনাথ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন মসজিদ ও মন্দির উন্নয়নে অনুদান দিয়ে আসছেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী মাসুম পারভেজ প্রতিদিন সংগ্রাম করে সংগ্রামী হয়ে উঠেছেন সফলতার অনুকরণ। আজ তিনি সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। সার, কীটনাশক, সিমেন্ট আর পরিবহন ব্যবসায় করেছেন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান।

তিনি জানান, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে গিয়ে সুদের ভারে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সুদমুক্ত অথবা স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পেলে তার ব্যবসাকে আরো বেগবান করতে পারবেন। আর বাস্তবায়ন হবে প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন ও তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার স্বপ্ন। শুধু ব্যবসায় সফলতা নিয়ে আসেননি, সমাজসেবা ও সমাজে কল্যাণমুলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন সদা সর্বক্ষণ। আর সৃষ্টি করেছেন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান।

প্রতিবন্ধী হিসেবে তিনি লালমনিরহাটের উত্তরা ব্যাংক থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে উত্তরা ব্যাংক, লালমনিরহাট শাখা ব্যবস্থাপক মাজেদুল আলম সরকার বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

"