করোনাভাইরাসে দুরবস্থায় নড়াইলের সাংস্কৃতিক কর্মীরা

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২০, ০০:০০

লুৎফুল আলম সজল, নড়াইল

নড়াইলে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা করে মূলত ৩৫টি সংগঠন। করোনায় বন্ধ হয়ে গেছে এদের প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফলে ভালো নেই এসব সংগঠনের শিল্পী, বাদক ও নাট্যকর্মীরা। ঘরভাড়া দিতে পারছে না সংগঠনগুলো। ২৫টি স্কুলে সংগীতের বিভিন্ন শাখার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জোড়াতালি দিয়ে চলছে প্রশিক্ষকদের সংসার। অনেকে পেশাও ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।

নড়াইলে পরিচিত তবলা বাদকদের একজন সন্তু বৈরাগী। ১০ বছর ধরে মূর্ছনা সংগীত নিকেতনে তবলার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। সম্প্রতি ঢাকায় বিভিন্ন বাসা ও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তবলা শিখিয়েছেন। করোনা সংকট শুরুর পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নড়াইলে এসে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে এখন তিনি পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। দুঃখ করে এই তবলচি বলেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত মানুষ আবার তাদের কর্মে ফিরেছেন। ব্যতিক্রম শুধু আমাদের ক্ষেত্রে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়াইল জেলায় সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে ৩৫টির মতো। এর মধ্যে সংগীত কণ্ঠ, যন্ত্র সংগীত তবলা, নৃত্য, চিত্রাংকন, কবিতা আবৃত্তি ও গীটার শেখানোর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে ২৫টির মতো। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক রয়েছেন শতাধিক, এছাড়া শিল্পী, বাদক এবং নাট্য কর্মী সংগঠকের সংখ্যা প্রায় ৩০০। জেলায় আরো দুইশতাধিক জারি গান, কবি গান, কীর্ত্তণ ও বাউল শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক চিত্রশিল্পী রয়েছেন। করোনা সংকটের প্রথম দিকে এসব পরিবারের কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এক-দুবার খাদ্য সহায়তা পেলেও এখন আর কেউ খোঁজ-খবর নিচ্ছে না।

সংগীতের বিভিন্ন শাখার একাধিক প্রশিক্ষক ও নাট্য কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, গণজারণ মঞ্চ ও জঙ্গিবাদ বিরোধী আন্দোলন, নড়াইল মুক্ত দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের সর্বস্ব ঢেলে দেই। পরম মমতায় ছেলেমেয়েদের সংগীত, নৃত্য, ছবি আঁকা, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদি শেখালেও এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমাদের অনেকেরই প্রশিক্ষণের আয়ের ওপর সংসার চলে। এখন এই বিপদের সময় তেমন কেউ খোঁজ-খবর নিচ্ছেন না।

মূর্ছনা সংগীত নিকেতনের সভাপতি শামীমূল ইসলাম টুলু। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর নিজস্ব কোনো ভবন বা ঘর নাই। প্রত্যেক সংগঠনের ঘর ভাড়া নিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করতে হয়। ছাত্রছাত্রীরা বেতন ও সদস্য চাঁদা বা ভর্তুকি না দেওয়ায় প্রত্যেকটি সংগঠনের কমপক্ষে ৫ মাস ঘর ভাড়া বকেয়া পড়েছে। তারপরও মূর্ছনা অন লাইন ক্লাস কার্যক্রম চালু করেছে বলে জানান।

নড়াইল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্পাদক ও চিত্রা থিয়েটারের সাবেক সম্পাদক শরফুল আলম লিটু। বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং শিল্পকলা একাডেমি থেকে যেসব অসচ্ছল শিল্পী অনুদান পাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দেলনে তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এসব অনুদানে দাবিদার প্রকৃত অনেক শিল্পী অনুদান থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। শিল্পীদের তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে এসব বিষয় দেখা উচিত।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির সম্পাদক মলয় কু-ু। জানতে চাইলে শিল্পীদের দুরাবস্থার স্বীকার করেন তিনি। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, জেলায় অনেক জারি ও বাউল শিল্পী, কবি সাহিত্যিক চিত্রশিল্পী অসহায়ভাবে দিন কাটাচ্ছেন। করোনাকালে প্রণোদনা হিসেবে এ পর্যন্ত ৫০ জন দুস্থ অসহায় সংগীত শিল্পী, কবি ও নাট্য কর্মীকে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। পরে আরো ৪০ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে এ বছর জেলার অসচ্ছল ৬৯ জন কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীকে ১০ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ২৩টি সংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অসচ্ছল শিল্পীদের তালিকা সঠিকভাবে করা শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নড়াইল জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থেকে কিছু অনুদান এসেছিল, যা কিছু শিল্পীদের দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা মন্ত্রণালয় থেকে আরো কিছু অনুদান পাওয়া যায় কি না, চেষ্টা করছি। আরো কিছু অনুদান পেলে তালিকা তৈরি করে সহযোগিতা করা হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

"