সোনারগাঁয়ের চাঁই-বুচনার কারিগরদের দৈন্যদশা

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২০, ০০:০০

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্লাস্টিক সুতার তৈরি ম্যাজিক চাঁইয়ের কারণে দৈন্য জীবন কাটাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বাঁশের তৈরি চাঁই-বুচনার কারিগররা। সারা বছর তেমন বিক্রি না থাকলেও প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে হাজার হাজার বাঁশের চাঁইবুচনা বিক্রি করতেন তারা। এখন দখল-দুষণে নদীতে মাছের আকাল, খাল-বিলেও আগের মতো মিলছে না মাছ। ফলে জেলেরা বাঁশের চাঁইবুচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তার ওপর চলছে করোনার আঘাত।

চাঁই কারিগররা বলছেন, প্লাস্টিকের ম্যাজিক চাঁইয়ের পাশাপাশি এ বছর করোনা ভাইরাসের কারনে তাদের অবস্থা খুবই নাজুক। করোনায় তাদের চাঁই বিক্রি বন্ধ। তারা এখন শুধু চাঁই তৈরি করে মজুদ করছেন। অনেকে কিভাবে মহাজনদের দাঁদন পরিশোধ করবেন আর কিভাবে সারা বছর খেয়ে পরে বেঁচে থাকবেন এমন দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

চাঁই তৈরির কারিগর বানু সরকার ও মনোরঞ্জন দাস জানান, অন্যান্য চাঁইয়ের চেয়ে চিড়িং মাছের চাঁইয়ের চাহিদা বেশি। সোনারগাঁ ছাড়াও দেশের পটুয়াখালী, ফরিদপুর, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর জেলার মানুষ অর্ডার দিয়ে এখানে চাঁই কিনতে আসেন। কিন্তু এ বছর বর্ষা মৌসুমে কোন অর্ডার বা বেচা বিক্রি নাই। আমরা এখন কষ্টে দিন কাটিয়ে চাঁই তৈরি করে জমাট করছি।

সরেজমিন উপজেলার বিভিন্নস্থানে ঘুরে দেখা যায়, সোনারগাঁ পৌর এলাকার সাহাপুর ও বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের সাতভাইয়া পাড়া ও রামগঞ্জ গ্রামের শতাধিক পরিবার চাঁই-বুচনা তৈরির পেশায় জড়িত। সারা বছর চাঁই তৈরি করা হলেও বর্ষা মৌসুমে চাঁইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। বাঁশ দিয়ে তৈরি সোনারগাঁয়ের চাঁই-বুচনা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন কারিগররা। বংশ পরাম্বরায় তাদের উপার্জনের একমাত্র পথ চাঁই তৈরি করা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাঁশের তৈরি চাঁইবুচনায় শুধুমাত্র চিংড়ি মাছ ধরা যায়, আর ম্যাজিক চাঁইয়ে হরেক রকমের মাছ ধরা পড়ে। প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাত লম্বা প্লাস্টিকের ম্যাজিক চাঁই কিনতে জেলেদের খরচ পড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা। এ চাঁই পাততে পানিতে নামতে হয় না। ৪-৫টি ম্যাজিক চাঁই হলেই একটি জেলে পরিবারে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারে।

অপরদিকে বাঁশের তৈরি চাঁইবুচনা তৈরি করতে খরচ পড়ে মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। হাটে-বাজারে এগুলো বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ শত টাকা পর্যন্ত। এ চাঁইবুচনা জেলেদেরকে গভীর পানির নিচে গিয়ে রাখতে হয়। ২০০-৩০০ বাঁশের তৈরি চাঁই বুচনায় এক কালিন খরচ পড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। অনেক পরিশ্রমের পরও একটি জেলে পরিবারে দৈনিক রোজগার হয় মাত্র ৫০০-৭০০ টাকা। সেই জন্য বাঁশের তৈরি চাঁই বুচনার প্রতি জেলেদের এখন আর তেমন আগ্রহ নেই।

কারিগররা জানান, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মহাজনদের কাছ থেকে দাঁদন নিয়ে বাঁশসহ চাঁই-বুচনা তৈরির উপকরণ কিনে থাকেন। বয়ন শিল্প ঘরানার এ পেশায় তেমন আয় না থাকলেও অনেক পরিবারের সদস্যরা বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে যেতে পাড়েনি। এ শিল্পে বেশির ভাগ কারিগরই হলো নারী। এক সময় নারীরা সংসার সামলে ঘরে বসে এ কাজের মাধ্যমে বাড়তি আয় করে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়াও স্কুলপড়–য়া ছেলেমেয়েরাও মা-বাবাকে এ শিল্পে সহযোগিতা করছে।

চাঁই তৈরি কাজের সঙ্গে জড়িত অনাথ দাস, হরে কৃষ্ণ সরকার, সনদ সরকার, রণজিৎ সরকার, জোকেশ দাস, মরন দাস। এরা সবাই উপজেলার সাহাপুর, সাতভাইয়া পাড়া ও রামগঞ্জের বাসিন্দা। তারা জানান, তিন গ্রামের শতাধিক পরিবার চিংড়ির চাঁই তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু বিদেশ থেকে ম্যাজিক চাঁই আমদানী ও মহামারী করোনায় তাদের তৈরি চাঁইয়ের বেচা বিক্রি নেই বললেই চলে।

সাহাপুর গ্রামের চাঁই তৈরির কারিগর সনদ সরকার জানান, রকাই জাতের মুলি বাঁশ দিয়ে চাঁই তৈরি করা হয়। এ বাঁশ চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আনা হয়। স্থানীয় আনন্দবাজার ও কাইকারটেক হাটে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা চাঁই কিনতে আসেন। এ বছর করোনার জন্য কোন জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা চাঁই কিনতে আসে না। তাছাড়া কোন রকম সরকারী সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেনা তারা।

 

"