মেহেরপুরের পশু খামারিদের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০

দিলরুবা খাতুন, মেহেরপুর

কয়েক বছর ধরে ভারতীয় গরুর বদলে দেশীয় পশু দিয়েই কোরবানির চাহিদা মিটানো হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় অনেকে ঝুঁকেছেন পশু মোটাতাজাকরণে। কোরবানি সামনে রেখে এবারও পশু মোটাতাজা করেছেন মেহেরপুরের অনেক খামারি। করোনার কারণে বাজার মন্দা হবার আশঙ্কা করছেন তারা। ফলে এজন্য নেওয়া ঋণের তলে পড়তে যাচ্ছেন তারা। জেলার বিভিন্ন খামারির সঙ্গে কথা বলে এই অবস্থা জানা গেছে।

খামারি ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, মেহেরপুরে এবার মোট ১ হাজার ৪৭৭টি খামারে ও পারিবারিকভাবে কোরবানির পশু মোটা-তাজা করা হয়েছে। এতে ছাগল, গরু ও মহিষসহ ৯৬ হাজার ৮৬৮টি গবাদিপশু কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। যার মধ্যে ছাগল ৫৭ হাজার ৯৪৭টি। করোনার আতঙ্কে ঋণগ্রস্ত খামারিরা বলছেন, পশু বাঁচিয়ে রাখা এখন পাহাড় অতিক্রিম করার মতো কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলা সদরে বেশ কয়েকটি খামার ঘুরে দেখা গেছে, নেপালি, অস্ট্রেলিয়ান, ফিজিয়ান, হরিয়ানাসহ নানা জাতের গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দরিদ্র কৃষকের বাড়িতে দুয়েকটি করে গরু পালন করা হয়। একে ঘিরে নানা রকম স্বপ্ন বুনছেন গরু পালনকারী ও খামারিরা। এই গরু পালন করেই সফলতার মুখ দেখছেন তারা। প্রতিবছরই কোরবানির পশু হাটে ন্যায্যমূল্য নিয়ে আতঙ্ক থাকে খামারি ও গরু পালনকারী চাষিদের মনে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতীয় পশু সীমান্ত পেরিয়ে না আসতে পারে সেদিকে সরকারের নজরদারির দাবি খামারিদের।

খামারিরা বলেন, করোনায় দাম বেড়েছে পশুখাদ্যের। এবার কোরবানি হওয়ার উপযুক্ত করতে খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু করোনার কারণে এবার ক্রেতা পাওয়া দুষ্কর হবে। সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হচ্ছে, যারা ঋণ নিয়ে খামার গড়েছেন। ভারতীয় গরু আমদানি হলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সদর উপজেলার বুড়িপোতা গ্রামের খামারি জিল্লুর রহমান জানান, তার খামারে ৫২টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছে। পশুপালনের খাদ্যসহ উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে ব্যয় বেড়েছে। করোনার কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আতঙ্ক পশুর ক্রেতা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে। তবু অনলাইনে বেচাকেনার চেষ্টা চলছে। তারপরেও এবার প্রতিটি খামারিকে লোকসান গুনতে হবে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেছেন।

এদিকে গৃহস্থ পরিবার জানায়, বসতবাড়িতে গরু পালন করা প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক পরিবারে। সারা বছর গরু পালনের পর কোরবানি হচ্ছে কাক্সিক্ষত বিক্রির সময়। এজন্য চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা চলছে। গরু বিক্রির টাকায় মিটবে পরিবারের চাহিদা। বাড়তি অর্থ দিয়ে আবারো নতুন গরু কেনার লক্ষ্য রয়েছে গরু পালনকারী পরিবারগুলোতে। সদর উপজেলার বুড়িপোতা গ্রামের আম্বিয়া খাতুন জানান, তিনি গত কোরবানির পর ৪০ হাজার টাকায় একটি বাছুর গরু কেনেন। লালনপালনে খরচ গেছে ৩০ হাজার টাকা। তিনি ১ লাখ টাকায় গরুটি না বিক্রি হলে পরিশ্রম বৃথা যাবে।

গাংনীর গরুর খামারি এনামুল হক জানান, গ্রাম থেকে শহর গরু পালন হচ্ছে সমানে। গ্রামের একেকটি বাড়ি যেন একেকটি খামার। পরিবার প্রধান নারী-পুরুষ মিলে পরিচর্যা করেন গরুগুলো। পরম যতেœ নিজের সন্তানের মতই আদর করা হয়। এই গরুগুলো যেন তাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। পুষ্টিসম্মৃদ্ধ খাবার ও সঠিক পরিচর্যায় গরুগুলো বেড়ে ওঠে কাক্সিক্ষত মাত্রায়। জেলার আর্থ সামাজিক উন্নয়নে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে গরু পালন। তাই কোরবানির পশু হাটে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার দাবি খামারিদের।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জাহাঙ্গীর আলম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার জেলায় প্রায় ১ লাখ কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। মোট ১ হাজার ৪৭৭টি খামারে ও পারিবারিকভাবে কোরবানির পশু মোটা-তাজা করা হয়েছে। খামারিরা ও প্রান্তিক চাষিরা একটা কোরবানির ঈদের পর আর একটা কোরবানির ঈদ আসা পর্যন্ত গবাদি পশুগুলোকে পরম মমতায় লালন পালন করে বিক্রি যোগ্য করে তোলেন। তাদের স্বপ্ন পূরণ না হলে শুধু খামারিরা নয় ঋণ নিয়ে খামারে ঘরু লালন পালনকারীদের কাছ থেকে টাকা ফিরে পাওয়া দুষ্কর হবে।

 

"