সাতক্ষীরার কৃষকদের এখনো মেলেনি সহযোগিতার আশ্বস

উপকূলীয় অঞ্চলে আম্পানের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-খামারিরা

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২০, ০০:০০

আকরামুল ইসলাম, সাতক্ষীরা

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন কৃষকরা। নষ্ট হয়েছে জমির ফসল, গাছের আম; ভেসে গেছে মাছের ঘের। তবে এখনো কোন সহযোগিতার আশ^াস পাননি ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, আম্পানে জেলায় প্রাণি সম্পদে ৮৭টি পোল্ট্রি মুরগির খামার, ৯১টি গবাদিপশুর খামার নষ্ট হয়েছে। টাকার হিসেবে এর ক্ষতি ধরা হয়েছে ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা, মৎস্য খাতে ১৭৬ কোটি ৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। ভেসে যাওয়া মাছের ঘের সংখ্যা ১০ হাজার ২৫৭টি। ক্ষতি হয়েছে ২৭ হেক্টর আমের জমি। নষ্ট হয়েছে ১৬ হাজার ২৯৬ মেট্রিকটন আম। সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়েছে দুই হাজার ৭২ হেক্টর জমির। সবজির মধ্যে রয়েছে, কলা, পটল, ঝিঙ্গাসহ নানা ধরণের সবজি। পানের ক্ষতি হয়েছে ২১৩ হেক্টর জমির ১২৭৮ মেট্রিকটন পান। টাকার হিসেবে ১০ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মাঝিয়াড়া এলাকার পান ব্যবসায়ী মৃত. নকুল হরির ছেলে স্বদেশ হরি। তিনি ১৫ কাঠা জমিতে পানের বরজ করেছিলেন। এই পানের বরজ ও ভিটেবাড়ি ছাড়া কিছুই নেই তার। পানের ক্ষেত থেকেই উপার্জিত অর্থে চলে তার সংসার। আম্পান ঝড়ে পানের ক্ষেতটি সম্পূর্ণ রূপে নষ্ট হয়ে গেছে।

আবেগাপ্লুত হয়ে স্বদেশ হরি জানান, সর্বস্ব সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ করে পানের বরজ করেছিলাম। ঝড়ে সেটি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি কোন কর্মকর্তা এখনো এসে চোঁখের দেখাও দেখেনি। আমরা অভাবী মানুষ, সরকারি সহায়তা ছাড়া নিজের সর্বস্ব হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

একই উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের ঘোনা গ্রামের কৃষক জিল্লুর রহমানের ছেলে হুসাইন আহম্মেদ ও জাহিরুল হাসান। ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সোনালী মুরগির খামার করেছিলেন দুই ভাই। তবে ঝড়ে খামারটি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘর চাপা পড়ে মারা গেছে ৫ হাজার সোনালী মুরগী। মুরগি খামারী হুসাইন আহম্মেদ জানান, নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ১৪ শতক জমির ওপর মুরগির খামার করেছিলাম। ঝড়ের রাতে সব শেষ হয়ে গেছে। সরকারি দফতরে জানিয়েছে তবে কোন সহযোগিতার আশ^াস পাইনি। এখন ১০ লাখ টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছি।

একইভাবে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন জেলার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রকাটি গ্রামের বাসিন্দা সুরত আলী গাজীর ছেলে আসলাম গাজী ও এরশাদ গাজী। চাকলা বিলে ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩৮ বিঘার একটি বাগদা চিংড়ির ঘের করেছিলেন তিনি। ভাই এরশাদ গাজী শুভদ্রকাটি বলে করেছিলেন ১৩৬ বিঘার মাছের ঘের। দুই ভাইয়ের মাছের ঘের ভেসে গেছে। আসলাম গাজী জানান, এখনো কেউ খোঁজ নেয়নি। এলাকার উপকূলীয় বাঁধ এখনো ভাঙা। জেলা প্রশাসক বাঁধ মেরামত ও ত্রাণ দিবেন জানিয়েছেন, তবে ঘের ব্যবসায়ীদের বিষয়ে কিছু বলেননি। একই অবস্থা আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সুভদ্রকাটি গ্রামের সোহবাব সানার।

সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (খামারবাড়ি) উপপরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের সচিব স্যার কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রণয়ণ করতে বলেছিলেন। কৃষক শ্রেণির মানুষদের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা আমরা প্রস্তুত করে রেখেছি। এখনো কোন নির্দেশনা পায়নি। সরকার যদি কোন সহযোগিতা এসব কৃষকদের দেয় তবে আমরা সেগুলো তাদের মাঝে পৌঁছে দিবো।

একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছি। তবে এসব ক্ষতিগ্রস্থরা কোন সুযোগ সুবিধা পাবে কিনা এমন কোন নির্দেশনা আমরা এখনো পাইনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, মৎস্য খাতে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যা সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের চিংড়ি চাষীরা পাবেন। সরকার শতকারা ৪ ভাগ সুদে ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্য ব্যবসায়ীদের লোন দিবেন। সাতক্ষীরা জেলায় ১৩ হাজার ৪৭৭ হেক্টর জমির চিংড়ি, সাদা মাছ, চিংড়ির রেনু ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে ১৭৬ কোটি ৬ লাখ টাকার। এসব ক্ষতিগ্রস্থ ঘের ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত করে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

 

"