গাইবান্ধার ৩৪টি পয়েন্টে নদী ভাঙন

প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২০, ০০:০০

গাইবান্ধা প্রতিনিধি

নদী বেষ্টিত জেলা গাইবান্ধা। এ জেলার উপর দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, কাটাখালি, ঘাঘট, বাঙ্গালী, করতোয়া, আলাইসহ কয়েকটি নদ-নদী। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে এই নদীগুলো এ জেলার মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। গত ১৫ দিন আগেও এই নদী বেষ্টিত বেশীর ভাগ চরাঞ্চল ছিল ধুধু মরুভুমির মতো। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে এই নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধির ফলে গত এক সপ্তাহে এই জেলার প্রায় ৩৪টি পয়েন্টে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ১৪টি পয়েন্ট পরিদর্শন করা হয়েছে, ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, কাটাখালি, ঘাঘট, বাঙ্গালী, করতোয়া, আলাই নদী বেষ্টিত সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৩৪টি পয়েন্টে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে ।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদী বেষ্টিত বেলকা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। এ উপজেলার ১০টি পয়েন্টে গত দুইমাস ধরে নদী ভাঙনের ফলে ইতোমধ্যে শতাধিক বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীণ হয়েছে।

বেলকা ইউনিয়নের সাদেক আলী জানান, ‘ভাঙন প্রতিরোধে নামমাত্র বালি ভর্তি বস্তা ফেলানো হয়। আর শান্তনা দেওয়া হয়। এভাবে নদী ভাঙনের ফলে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।’

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানী ইউনিয়েনের ৫টি পয়েন্টে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র নদে হঠাৎ পানি বৃদ্ধির ফলে এই ভাঙন দেখা দেয়। তবে ভাঙন প্রতিরোধে এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন কাজ শুরু করেনি।

কামারজানী ইউনিয়নের কলেজ ছাত্র বিজয় কুমার জানান, কামারজানী ইউনিয়নে গত দুই বছরে সরকারি স্কুল, মসজিদ, মাদরাসাসহ কয়েক হাজার পরিবারের বসতভিটা নদী গর্ভে বিলীণ হয়েছে। সরকার যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয় আগামীতে এই ইউনিয়নটি সম্পূর্ণ নদী গর্ভে বিলীণ হবে।

ফুলছড়ি উপজেলার কাতলামারী ও খাটিয়ামারি এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত কয়েক বছরে এ উপজেলার মানচিত্র পাল্টে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশে গেছে। ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারি চরে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই চরটি নদী গর্ভে বিলীণ হবে। এতে হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।

ফজলুপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আলমগীর হোসেন জানান, দুই বছরে খাটিয়ামারি বাজারের শতাধিক স্থাপতা নদী গর্ভে বিলীণ হয়েছে। ফুলছড়ি উপজেলার দুর্গম চরের কারনে এই স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন কাজ করে না । তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘চরে থাকি বলে আমরা মানুষ না?

সাঘাটা উপজেলার ভরতখালী ইউনিয়নের বড়নতাইড় গ্রামে যমুনা নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় ¯্রােতের তীব্রতা বেড়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে এ ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ একর ফসলী জমি নদী গর্ভে বিলীণ হয়েছে।

সাঘাটার ভরতখালী ইউপি চেয়ারম্যান শামসুল আজাদ শীতল জানান, ‘যখন শুকনো মৌসুম তখন বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোন কাজ চোখে পড়েনা। যখন বর্ষা মৌসুম আসে বা নদী ভাঙন দেখা দেয় ঠিক তখনি শুরু হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৌড়-ঝাপ।’

নদী ভাঙনের শিকার সাবেক কৃষি কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার যে গ্রামগুলোতে আমরা অবস্থান করি সেই গ্রামগুলো নদী গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। বড়নতাইড় গ্রামে জন্মগ্রহনের স্মৃতি হারিয়ে নিজেকে নদীর কাছে পরাজিত সৈনিক মনে হচ্ছে।’

অপর দিকে এই উপজেলার বাঙ্গালী নদীর উপর গুরুত্বপূর্ণ মেলান্দহ সেতু অবস্থিত। এই সেতুর দক্ষিণে বাঙ্গলী নদীর ভাঙনের কবলে চর পাড়া গ্রাম নদী গর্ভে বিলীণের পথে।

এ গ্রামের নদী ভাঙনের হুঁমকিতে স্থানীয় রাজু মিয়া অভিযোগ করেন, এই স্থানে ভাঙন ঠেকাতে বার বার কাজ করার কথা বললেও কোন কাজ করছেনা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

সাঘাটা হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী জানান, এ উপজেলায় গত দুই বছরে হলদিয়া ইউনিয়নের ২টি মসজিদ, একটি কবর স্থান, ৫ কি.মি পাকা রাস্তাসহ তিন শতাধিক পরিবারের বসতভিটা যমুনার গর্ভে বিলীণ হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অসহায় মানুষগুলো অনেক কষ্ট করে জীবন যাপন করছে। এখনো হুঁমকির মুখে একটি মাদরাসা, চারটি সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্টান, দুইটি ঈদগাহ মাঠসহ আরো কয়েক হাজার পরিবার।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন জানান, ‘বাঙ্গালী নদী বেষ্টিত গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ, রাখাল বুরুজ, আদর্শগ্রাম ও সাঘাটা উপজেলার কচুয়া, রামনগর, গুজা এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দুই বছরে এসব এলাকার পাঁচ শতাধিক বসত ভিটা নদী গর্ভে বিলীণ হয়েছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোকলেছুর রহমান জানান, নদী ভাঙন প্রতিরোধে গাইবান্ধা জেলায় পাউবো’র কাজ অব্যাহত আছে। নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে যেসব এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে সেসব এলাকায় বালি ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুস শহিদ জানান, ‘গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন স্থানে নদী ভাঙন কবলিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে। ভাঙনের বাস্তব চিত্র নীতি নির্ধারক মহলে প্রেরণ করে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’

 

"