করোনায়ও আউলিয়া বাজারে কোটি টাকার লিচু বেচাকেনা

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২০, ০০:০০

মাইনুদ্দীন রুবেল, বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

দেশের পূর্ব সীমান্তঘেঁষা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় কোটি টাকার লিচু। দেশের বিভিন্ন স্থানে এপ্রিল মাসের মধ্যবর্তী সময়ে লিচুর ফলন হলেও বিজয়নগরে লিচু বাজারে আসে মে মাসের প্রথম দিকে। রসালো ও মিষ্টি হওয়ায় সারা দেশেই এ লিচুর চাহিদা আছে। করোনা প্রার্দুভাবে এবার উপজেলায় লিচুর বাম্পার ফলনেও তেমন হাসি নেই চাষি ও বাগান মহাজনদেন মাঝে। তবু সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন চাষিরা।

উপজেলার আউলিয়া বাজার, সিংগারবিল, হরষপুর, চান্দুরা, বিষ্ণুপুর, ছতরপুর, আজমপুর, চম্পকনগর বাজারে বিক্রি হয় অধিকাংশ লিচু। এসব বাজার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নরসিংদী, ভৈরব, নোয়াখালী, চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, শায়েস্তাগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, ফেনী ও রাজধানীর ব্যবসায়ীরা পাইকারি দরে লিচু কিনে নিয়ে যান।

উপজেলার সবচেয়ে বড় লিচু বাজার পাহাড়পুর ইউনিয়নের আউলিয়া বাজার। এলাকাবাসী ও চাষিরা জানান, আউলিয়া বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৮০-৯০ লাখ টাকার লিচু বেচাকেনা হতো। কিন্তু করোনার কারণে এইবার একটু কম হলেও বেচাকেনা ভালোই বলছেন তারা। গভীর রাতে চাষিরা ও বাগানের মহাজনরা লিচু নিয়ে বাজারে যান। ভোররাত চারটা থেকে শুরু হয়ে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যেই বেচা-কেনা শেষ হয়ে যায়। উপজেলার প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে একটি করে লিচু গাছ আছে। যাদের বাড়িতেই একটু জায়গা আছে, তারা প্রত্যেকেই বাড়িতে লিচুগাছ লাগান।

উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পাহাড়পুর, বিষ্ণুপুর, কাঞ্চনপুর, খাটিঙ্গা, কাশিমপুর, সিঙ্গারবিল, চম্পকনগর, আদমপুর, কালাছড়া, মেরাশানী, সেজামুড়া, কামাল মোড়া, নুরপুর, হরষপুর, মুকুন্দপুর, নোয়াগাঁও, অলিপুর, চান্দপুর, কাশিনগর, ছতুরপুর, রূপা, শান্তামোড়া, কামালপুর, কচুয়ামোড়া, ভিটিদাউপুর এলাকায় পাঁচ শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে দেশি লিচু, এলাচি লিচু, চায়না লিচু, পাটনাই লিচু ও বোম্বাই লিচু জন্মে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৩ সালের আগে থেকে বিজয়নগর উপজেলায় লিচুর কেনাবেচা শুরু হয়। কম শ্রমে বেশি লাভ হয় বলে ধানি জমিগুলোকেও লিচু বাগানে রূপান্তর করেছেন চাষিরা। লিচুর ফলন হওয়ার পর থেকে কয়েক দফায় বাগান বিক্রি হয়। এরমধ্যে গাছে মুকুল ও গুটি আসে প্রথম দফায় গাছ কিনেন স্থানীয় ও বিভিন্ন জেলার মহাজনরা। গাছে মুকুল ও গুটি একটু বড় হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় গাছ বিক্রি হয়। লিচু ছোট আকার ধারণ করলে তৃতীয় দফায় বিক্রি হয়। লিচু বড় আকার ধারণ করলে চতুর্থ দফায় বিক্রি হয়।

গত শনিবার রাত চারটা থেকে সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিজয়নগর উপজেলার আউলিয়া বাজারে চাষিদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাষিদের আগমনও বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ীরা এ প্রতিবেদককে জানান, এই বাজারে প্রতি হাজার দেশি লিচু দেড় হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকা, প্রতি হাজার এলাচি ও চায়না লিচু ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা, পাটনাই ও বোম্বাই লিচু ২ হাজার ২০০ থেকে ২৫০০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। করোনা না থাকলে দাম আরো একটু বাড়তি থাকতো বলেও জানান তারা।

হবিগঞ্জের ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন জানায়, তিন দিন ধরে তিনি এ বাজারে আসছেন। প্রতিদিন তিনি গড়ে প্রায় লাখ টাকার উওপরে লিচু কিনেন। করোনার কারণে গাড়ি নিয়ে আসতে সমস্যা হয়। গাড়ি নিয়ে আসতে হলে রাস্তায় পুলিশকে বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিয়ে আসতে হয়। লাভ একটু কম হলেও এখানকার লিচু অনেক ভালো ও মিষ্টি হওয়ায় চাহিদা থাকে বেশি।

আউলিয়া বাজারে ইজারার দায়িত্বে থাকা জসিম উদ্দিন মনা বলেন, প্রশাসন থেকে বাজারটি ডেকে নিয়েছি। তাই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয় কিন্তু অন্যান্য বছর থেকে এই বছর করোনার কারণে যে যত দিচ্ছে ততই নিচ্ছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিজির হোসেন বলেন, এবছর উপজেলাতে ৩৭০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়েছে যা গত বছর থেকে ২০ হেক্টর বেশি। আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতাসহ সার, কীটনাশক দিচ্ছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহের নীগার বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনাবলি দেওয়া আছে যেন কোনো ব্যবসায়ীদের হয়রানি না করা হয়। পুলিশ ব্যবসায়ীদের গাড়ি থেকে যদি টাকা নিয়ে থাকে বাজারের ইজিরার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বা যারা হয়রানি হয়েছেন তারা অভিযোগ দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

"