দুর্গাপুরে শতবর্ষী পদ্ম পুকুর ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২০, ০০:০০

কলিহাসান, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা)

নেত্রকোনার দুর্গাপুর পৌর সদরের বাগিচাপাড়ার শতবর্ষী সরকারি পদ্ম পুকুরটি রাতের আঁধারে ভরাট করে ফেলছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী। দখল কার্যক্রমে স্থানীয়রা বাধা দিয়ে আসলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া প্রভাবশালী বিপ্লবের কর্মকারের এহেন কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ জীবন পার করছে স্থানীয়রা। ইউএনও ও ডিসির দফতরে লিখিত অভিযোগ করেও সুফল পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। গত শনিবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে পুকুর দখল ও ভরাট এর মহাযজ্ঞের এ চিত্র চোখে পড়ে।

দখল কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে স্থানীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেও কোনো সুফল পাননি তারা। পুকুর ভরাটের ছবি দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিলেও টনক নড়ছে প্রশাসনের। কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত প্রভাবশালী। এ দখল উচ্ছেদ বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার চন্ডিগর ইউনিয়নের মৃত বিমল কর্মকারের ছেলে বিপ্লব কর্মকার। রাজনৈতিক কোন পরিচয় না থাকলেও সুবিধাভোগী রাজনৈতিক নেতার দাপুটে নেতা বনে যান বিভিন্ন সময়ে তিনি। যখন যে এমপি হবেন, তখন তিনি সেই এমপির আশীর্বাদ পুষ্ট লোক বনে যান ঠিকাদার বিপ্লব কৃষ্ণ রায়। নানা সময়ে বিভিন্ন সুবিধা নিতে সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে গড়ে তোলেন সখ্যতা। সখ্যতার বশে অনেকে হয়ে যান নিবেদিত। এসব কৌশল অবলম্বন করে অবাধ অর্থের পাহাড় জমিয়েছেন তিনি। অল্প সময়ে বিশাল টাকার মালিক বনে যাওয়ার পেছনের রহস্য কি জানতে সরকারি বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা ও তদন্ত সংস্থাদের নজরধারী কামনা করছেন স্থানীয়রা।

সূত্রে জানা যায়, পৌর সদরের বাগিচাপাড়ার সরকারি পদ্ম পুকুরটি ৬১ শতাংশ ভূমিতে বিস্তৃত ছিল। একদিকে করোনাভাইরাস আতঙ্ক, অন্যদিকে পৌর সদরের পাকা রাস্তার গার্ড ওয়াল ভেঙে লড়ি ট্রাক্টর দিয়ে বালি ভরাট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন বিধি নিষেধ তোয়াক্কা করছেন না এ দাপুটে প্রভাবশালী ব্যক্তি বিপ্লব কৃষ্ণ রায়। উপজেলা প্রশাসনের ব্যস্থতার ফাঁকে দখল করা পুকুরে বিপ্লব কর্মকার তরিগড়ি করে ঘর নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এ পদ্ম পুকুরের চিহ্ন চিরতরে মুছে ফেলতে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রাক-প্রস্তুতিও সম্পন্নের পথে। ভরাট করা জায়গার উভয় পাশে ইটের সারি সারি স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।

‘বাগিচাপাড়া পদ্ম পুকুর পাড়’ একটি পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি আবাসিক এলাকা। বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে এখানে বসবাস করে আসছে। সুসং দুর্গাপুরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এটি এখনো খ্যাত। বাগিচাপাড়ায় বিদ্যমান শতবছরের পুরোনো সরকারি জলাশয় পদ্ম পুকুরটি যেন ছিল কালের সাক্ষী। রাতের আঁধারে বিপ্লব কর্মকার পদ্ম পুকুরে বালি ফেলে ভরাট করছে। পৌরসভার রাস্তার গাইড ওয়াল ভেঙে ফেলছে। কোনো কিছুই তোয়াক্কা করেন না তিনি। জনস্বার্থে পরিবেশের ভারসাম্যের সহায়ক শতবর্ষী পদ্ম পুকুরটি রক্ষায় আইনানুসারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৌর পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি কামনা করে অভিযোগ দিলেও কাক্সিক্ষত রেজাল্ট পাননি ভুক্তভোগীরা।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত-২০১০) এর ৬ (ঙ) অনুযায়ী জাতীয় অপরিহার্য স্বার্থ ছাড়া কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি এমনকি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর ভরাট না করার বিধান রয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ২০১০ সালে সংশোধিত অনুযায়ী যেকোনো ধরনের জলাধার বা পুকুর ভরাট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ভরাট কারির বিরুদ্ধে আইনের ৭ ধারায় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে পরিবেশগত ক্ষতি ও বিধ্বংসী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।

সরকারি পুকুর ভরাট ও ভবন নির্মাণের বিষয়ে বিপ্লব কৃষ্ণ রায় প্রতিনিধিকে জানান, এ পুকুরটি আমার দখলে রয়েছে। সরকারিভাবে আমি বন্দোবস্ত নিয়েছি। আমি তো এ জায়গায় ভরাট ও ভবন নির্মাণের কাজ করতেই পারি। কোর্টের মাধ্যমে রায়ও আমার পক্ষে এসেছে।

এ ব্যাপারে ইউএনও ফারজানা খানম প্রতিনিধিকে জানান, সরকারি এ পুকুরটি নিয়ে দুই পক্ষের মাঝে টানাটানি চলছে। তবে পুকুরটির দ্বন্দ্ব নিরসনে বিজ্ঞ আদালত রায় দিয়েছে। ওই রায় নিয়েই মাটি ভরাট করছে। লিজ মানির রেকর্ডও তাদের রয়েছে। লিজ গ্রহীতা বিপ্লব কৃষ্ণ রায় প্রতি বছর খাজনা পরিশোধ করছে। তবে এ বিষয়টি আমি আরো গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।

 

"