ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে পাবনার শুঁটকি

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০

খালেকুজ্জামান পান্নু, পাবনা

ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ২৫ দেশে রফতানি হচ্ছে পাবনার শুঁটকি। অভ্যন্ত্ররীণ চাহিদা মিটিয়ে পাবনার শুঁটকি সবচেয়ে বেশি রফতানি হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। জেলার সাঁথিয়া, বেড়া, সুজানগর ও চাটমোহরের চলনবিল এলাকার বিভিন্ন মাছের আড়ত থেকে সংগ্রহ করে চাতালে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করে সৈয়দপুর মোকামে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে এসব শুটকি মাছ রপ্তানি করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

সরেজমিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে জানা যায়, বিল ও নদীর পানি কমতে শুরু করায় সাঁথিয়া উপজেলার আরাজী গোপিনাথপুর, সাতানীর চর ও গাজনার বিল, বেড়ার কৈটোলা, সুজানগরের মসজিদ পাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া এলাকায় চলছে শুঁটকি তৈরির ধুম। বিলের পানি কমতে শুরু করলেই শুঁটকি তৈরির লক্ষ্যে মাছ আহরণ শুরু হয় বলে জানা গেছে। কার্তিক মাস থেকে শুরু হয়ে চলে চৈত্র মাস পর্যন্ত। গ্রামের মধ্যে ঢুকলেই চোখে পড়ে শুঁটকি মাছের চাতাল। এলাকার বিভিন্ন সড়ক, পতিত জমিতে দেখা যায় শুঁটকি মাছের চাতাল। ঘুঘুদহর বিল, সোনাই বিল, বড় বিল, ছোট বিল, চলন বিল, মুক্তরের বিল ও গাজনার বিল থেকে সংগ্রহ করা হয় মাছ। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে পুঁটি মাছ, বায়েম মাছ, চাঁদা মাছ, টাকি মাছসহ বিভিন্ন জাতের মাছ।

জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন চাতালে ৩০০ থেকে ৩৫০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বাজার মূল্য শত কোটি টাকা । দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা সরাসরি এসব অঞ্চলের চাতাল থেকে পছন্দের শুঁটকি মাছ কিনে নিয়ে যায়। শুঁটকি মাছের মান ভেদে তারা ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের (ভাল মানের) শুঁটকি মাছ মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, মালেশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় ২৫টি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। সাধারনত এসব দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে রয়েছে মিঠা পানির শুঁটকি মাছের কদর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাঁথিয়ার সাতানীরচর, আরাজী গোপিনাথপুর, বেড়ার কৈটোলা, সুজানগরের মসজিদপাড়া, চাটমোহরসহ প্রত্যন্ত বিল এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক পরিবার শুঁটকি তৈরির কাজে জড়িত রয়েছেন। এসব পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা দিন হাজিরায় কাজ করছেন শুঁটকি চাতালে। কাজের ধরন অনুয়ায়ী তারা মজুরি পাচ্ছেন ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এ কাজ করে তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছেন।

শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত সামর্থ, নাজমা, জুলি, ইয়াসমিন, ফারুক, হাবলু, তাহমিনাসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক জানান, তিন কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি তৈরি হয়। প্রকার ভেদে শুঁটকির বাজার মূল্য ২০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। চলতি মৌসুমে বিল এলাকার আহরিত মাছ থেকে ৩০০-৩৫০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। যার বাজার মূল্য ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান।

পাবনার সাঁথিয়ার আরাজী গোপিনাথপুর ও সাতানির চরের শুঁটকি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন,‘আমার চাতাল থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪/৫ মেট্রিক টন শুঁটকি মাছ উৎপন্ন করে মোকামে পাঠাই।

দেশের উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর জেলার বিশিষ্ট শুঁটকি ব্যাবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, পাবনার পুঁটি মাছের শুঁটকি ভারতে সবচেয়ে বেশি চলে। তাই আমি এ শুঁটকি ক্রয় করি। আর অন্যান্য শুঁটকির সবচেয়ে বেশি চাহিদা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের নিকট। তারা ইউরোপসহ মধ্যেপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব শুঁটকি রফতানি করেন।

চাটমোহর উপজেলার বদনপুর গ্রামের মৎস্যজীবী হেলাল উদ্দিন জানান, তিনি পাইকারিভাবে পুঁটি মাছ ক্রয় করেন স্থানীয় জেলেদের নিকট থেকে। পরে সেগুলোকে মানভেদে প্রক্রিয়াজাত করেন। তিনি বলেন, মানভেদে শুঁটকি বিক্রি করেন প্রতি মণ ৬ থেকে ৮ হাজার টাকায়। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও প্রতি মণ শুঁটকি থেকে গড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করেন।

পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, বাজারে পাবনার শুঁটকির সুনাম আছে। আমরা শুঁটকির ব্যাপারে উদ্যাগ গ্রহণ করার পরিকল্পনা পাঠিয়েছি মন্ত্রণালয়ে।

তিনি আরো বলেন, জেলা মৎস্য বিভাগের তদারকি, সরকারি প্রশিক্ষণ এবং নীতিমালাসহ সবধরনের সহযোগিতা ও নজরদারির ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। শুঁটকি সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও নীতিমালা তৈরি করা গেলে এ খাত থেকেও বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অজূন করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

 

"