যশোর

প্রকাশ্যে বন্ধ বাল্যবিবাহ গোপনে হচ্ছে সম্পন্ন

* সচেতন নয় অভিভাবক মিলে না সহযোগিতা * অসাধু কাজি ও জনপ্রতিনিধিরা জড়িত

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

এইচ আর তুহিন, যশোর

যশোর সদরের শফিয়ার রহমান মডেল একাডেমির জেএসসি পরীক্ষার্থী লিজা খাতুন। বাবা-মায়ের ইচ্ছায় তার বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এলাকাবাসী তা মানতে না পেরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানিয়ে দেয়। প্রশাসনের সহায়তায় সে যাত্রায় লিজার বাল্যবিবাহ বন্ধ হলেও, মাসখানেক পর এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে গোপনে বিয়ে দেওয়া হয় তার। গত ২ নভেম্বর শুরু হওয়া জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি সে। স্বামীর সংসার সামলাতেই সে এখন ব্যস্ত।

শুধু লিজা খাতুন নয়, যশোরে তার মতো অনেক কন্যাশিশুর বিয়ে হচ্ছে এভাবেই। অভিভাবকদের অসচেতনতায় বাল্যবিবাহর অভিশাপ থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে নারীনেত্রীরা মনে করছেন, কিছু অসাধু কাজি এর সঙ্গে জড়িত। আর শিক্ষকরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে নাম ও বয়স জালিয়াতি করে বাল্যবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে সহযোগিতা করছেন অসাধু মেম্বাররা।

জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদফতরের তথ্য মতে, প্রশাসনের সহায়তায় ২০১৮ সালে জেলায় অন্তত ১৪১টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়। আর চলতি বছরের ৯ মাসে এর সংখ্যা ৬৪টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ৯টি, মে মাসে ১০টি, জুনে ১০টি, জুলাইয়ে ৫টি, আগস্টে ৪টি ও সেপ্টেম্বরে ৮টি।

এদিকে গত ১২ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কলসেন্টার ৩৩৩ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ সেন্টারের মাধ্যমে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত যশোরে ২৬০টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৪টি, বাঘারপাড়ায় ২৪টি, অভয়নগরে ২৭টি, ঝিকরগাছায় ২৮টি, চৌগাছায় ৩২টি, মনিরামপুরে ১৯টি, কেশবপুর এবং শার্শা উপজেলায় ৪৮টি করে বাল্যবিয়ে প্রশাসন বন্ধ করে। কিন্তু বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হলেও পরে গোপনে আবার বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রশাসন ও স্থানীয়দের তৎপরতায় অনেক কিশোরীর বাল্যবিয়ে হলেও, পরে গোপনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে স্থায়ীভাবে বাল্যবিয়ে ঠেকানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি অসহযোগিতার কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে।

গোপনে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন লিজার বাবা জিয়ারুল মোল্লা। তিনি বলেন, সংসারে আর্থিক অনটন লেগেই থাকে। তার মধ্যে লিজার পড়াশোনার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ জন্য তার বিয়ের আয়োজন করেছিলাম। এলাকার লোকজন প্রশাসনকে খবর দিয়ে বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পরে গোপনে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি।

যশোর শহরতলীর শফিয়ার রহমান মডেল একাডেমির প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, বিয়ে বন্ধ করতে গেলে হিতেবিপরীত ঘটে। স্থানীয় লোকজন চাপ দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষের ওপর। বাল্যবিয়ে বন্ধে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিবাহিত মেয়েদের স্কুলে ভর্তি নেওয়া হয় না। পাশাপাশি ক্লাসে ছাত্রীদের বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কিত শিক্ষা দেওয়া হয়।

যশোর শহরের মাহমুদুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ওহেদুল ইসলাম বলেন, দরিদ্রতার কারণেই অধিকাংশ বাল্যবিয়ে সংঘটিত হয়। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অভিভাবকরা মেয়েদের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতই বিয়ে দিচ্ছেন। তিনি উদারহণ টেনে বলেন, ‘আমার স্কুলেরই অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী বিয়েতে রাজি না হলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের লোকজন উপস্থিত হলেও সে একইভাবে আত্মহত্যার হুমকি দেয় এবং তাকে বিয়ে দিতে বাধ্য করে বলে জানান তিনি।’

জেলা মহিলা পরিষদের সম্পাদক তন্দ্রা ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো বাল্যবিয়ে বন্ধ করেছি। কিন্তু পরে দেখেছি অভিভাবকরা গোপনে আত্মীয় বাড়িতে নিয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন পর জানতে পারি। তখন আসলে তেমন কিছু করার থাকে না।’

বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে তন্দ্রা ভট্টাচার্য বলেন, বাল্যবিয়েকে আমি ক্যানসার হিসেবেই দেখি। এর কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়সে মা হতে গিয়ে শরীর ভেঙে যায়। পরে স্বামীও তাকে পছন্দ করে না। অনেক সময় তারা পরকীয়ায় আসক্ত হয়। পারিবারিক অশান্তি তো আছেই।

যশোর মহিলাবিষয়ক অধিদফরের উপপরিচালক সখিনা খাতুন। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণিতে পড়–য়া মেয়েরাই বাল্যবিয়ের শিকার হয়। আর্থিক অনটন আর অভিভাবকদের অসচেতনতাই এ জন্য দায়ী। তিনি জানান, বাল্যবিয়ে বন্ধ করার পর অভিভাবকরা মেয়েকে আত্মীয় বাড়ি নিয়ে গোপনে বিয়ে দিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে কিছু অসাধু কাজি জড়িত। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অনেক সময় বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা সচেতন করছি, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে হয় না। এটা শুধু বিয়ের স্বীকৃতি।

তিনি বলেন, বাল্যবিলে রোধে অভিভাবকদের সচেতনতার জন্য প্রতি মাসে উঠান বৈঠকসহ দরিদ্র পরিবারকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করার জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

"