চুয়াডাঙ্গায় নদ-নদীতে কোমর-বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার

পলি জমে কমছে নাব্য হুমকিতে দেশীয় মাছ

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

এস এম শাফায়েত, চুয়াডাঙ্গা

চুয়াডাঙ্গার নদ-নদীতে অবৈধভাবে কোমর-বাঁধ (বাঁশের তৈরি বাঁধ) দিয়ে মাছ শিকার করছেন প্রভাবশালীরা। জেলার মাথাভাঙ্গা নদী ও ভৈরব নদের বিভিন্ন স্থানে এই বাঁধ দেওয়ায় নিধন হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। এদিকে অবৈধ বাঁধ ও নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করায় মাছ নিধনের পাশাপাশি নাব্য হারাচ্ছে নদী।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমানে মাছের আকালের সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধি এবং অতৃপ্ত রসনার পাশাপাশি পুষ্টিস্বল্পতার জন্য এই ধরনের মাছ শিকারই দায়ী।

চুয়াডাঙ্গায় মাথাভাঙ্গা নদী ও ভৈরব নদসহ পাঁচটি নদী রয়েছে। এরমধ্যে শুকিয়ে যাওয়া নবগঙ্গা ও কুমার নদ বাঁচাতে খনন কার্যক্রম চলছে। আর যে নদীগুলোতে পানি বা জলাধার রয়েছে সেগুলো এখন কোমর-বাঁধ দখলদারদের কবলে।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় প্রায় ২৬ কিলোমিটার মাথাভাঙ্গা নদী ও ৫৮ কিলোমিটার ভৈরব নদের প্রবাহ রয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, জেলার বিষ্ণুপুর ব্রিজ, কেশবপুর, বাস্তপুর, রঘুনাথপুর, আরামডাঙ্গা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মাথাভাঙ্গা নদীতে বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ শিকার করা হচ্ছে। নদী বিধৌত এলাকায় নদীতে আড়াআড়ি বাঁধ দেওয়ার কারণে মাটির পলি এবং অন্যান্য পরিপোষক পদার্থ পানিতে মিশে ছড়িয়ে যেতে পারছে না। যার কারণে নদীতে পলি জমে নাব্য হারাচ্ছে। সেই সঙ্গে ¯্রােত বাধাগ্রস্ত হয়ে নদীর পাড় ভাঙ্গনের সৃষ্টি হচ্ছে। একই চিত্র ভৈরব নদতেও।

চুয়াডাঙ্গায় মাথাভাঙ্গা নদীর স্বাভাবিক অবস্থা রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে ‘মাথাভাঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন’ সংগঠন। এ বিষয়ে কথা হয় সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক হামিদুল হক মুন্সির সঙ্গে। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, কিছু দেশী প্রজাতির মাছ প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ খুঁজে থাকে। কিন্তু কোমর-বাঁধের কারণে তারা গন্তব্যে প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশে যেতে পারে না। ফলে সঠিক সময়ে ডিম দিতে পারে না। এসব দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশ বিস্তার হুমকির মুখে। এছাড়া কারেন্ট জাল ব্যবহারের ফলে ছোট পোনা এবং মা মাছ ধরা এবং বিক্রিও বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।

পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, কৃষিজমিতে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, খাল-বিল-ডোবা ভরাট, উন্মুক্ত জলাশয়ে বাঁধ নির্মাণসহ মাছের বিচরণক্ষেত্রের প্রতিকূল পরিবর্তনের কারণে দিনদিন দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে। নদী, খাল ও অন্যান্য জলাধার, জলজ উদ্ভিদ ও মাছ আমাদের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ। মানব সৃষ্ট কারণে সেই সম্পদ আজ ধ্বংসের পথে।

নদী রক্ষাসহ পরিবেশ নিয়ে কাজ করছে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’। এর খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন চুয়াডাঙ্গার মাহফুজুর রহমান মুকুল। তার মতে, আগে মানুষ বাজার থেকে নিয়মিত দেশী মাছ কিনতেন। অনেকে নিজেদের পলো, জাল, বড়শি দিয়ে খাল, বিল, পুকুরে মাছ ধরতেন। এ ছাড়া টাকি/চ্যাং, আইড়, পুঁটি, খলিসা, তারা গুছে, ট্যাংরা, বাইন, কালবাউশসহ ৫৫ প্রজাতির মাছ বিপন্ন প্রায়। জলাশয়-ডোবা ভরাট, অবৈধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা, জমিতে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারসহ মাছের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়ায় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে জেলার দামুড়হুদা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ‘কিছু অসাধু মৎসজীবী গোপনে চুরি করে নদীতে বাঁধ দিচ্ছে। এদের তালিকা তৈরি করে ইউএনও নিকট দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত এসব উচ্ছেদ করাসহ সমস্যা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দামুড়হুদা ইউএনও এস এম মুনিম লিংকন স্বীকার করেন, ‘নদীতে অবৈধভাবে বাঁধ দেওয়ার কারণে যেমন নাব্য সংকট তৈরি হচ্ছে, তেমনি ভাবে দেশী প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘নদী রক্ষার্থে আমাদের সবার সচেতন হওয়া দরকার। তবে খুব দ্রুত এসব অপসারণসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

"