দুরবস্থায় বেড়ার শেষ পাট ক্রয়কেন্দ্রটি

প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০

আরিফ খান বেড়া, পাবনা

পাবনার বেড়া উপজেলা এক সময় দেশের অন্যতম পাট ক্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিল। সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) নিয়ন্ত্রিত ৮-১০টি পাটকল এ উপজেলায় ক্রয়কেন্দ্র বসিয়ে পাট সংগ্রহ করতো। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরে পাটকলগুলো একে একে ক্রয়কেন্দ্রগুলো গুটিয়ে নেওয়ায় এখন তা মাত্র একটিতে নেমে এসেছে। আমিন জুটমিলস নামের পাটকলের একমাত্র এই ক্রয়কেন্দ্রটিও ধুঁকে ধুঁকে চলছে। পাটকলটি বকেয়া পরিশোধ না করায় বিক্রেতাদের কাছ থেকে খুব একটা পাট সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে সব মিলিয়ে উপজেলার পাটের বাজারে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।

পাট ব্যবসায়ী ও পাটচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলায় প্রচুর পাট উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত পাটের ওপর ভিত্তি করে বেড়ায় গড়ে উঠেছিল উত্তরাঞ্চলের প্রসিদ্ধ পাট ব্যবসাকেন্দ্র। এক সময় বেড়ায় বিজেএমসির আট থেকে ১০টি পাটকলের পাট ক্রয়কেন্দ্র ছিল। এখনও বেড়া বাজারের পাটপট্টিতে পাটকলগুলোর ১৫ থেকে ২০টি বড় বড় শূন্য গুদাম পড়ে আছে। এ ছাড়াও রয়েছে পাট ব্যবসায়ীদের নিজস্ব আরো অনেক পাটের গুদাম। বেশির ভাগ পাটের গুদামই এখন ফাঁকা পড়ে আছে। আবার কিছু গুদাম অন্য পন্যের গুদাম হিসাবে ভাড়া দিচ্ছেন তারা। চার বছর আগেও বেড়ায় চারটি পাটকলের ক্রয়কেন্দ্র ছিল। সেগুলো হলো হাফিজ জুটমিলস, গুল আহম্মদ জুটমিলস, আমিন জুটমিলস ও লতিফ বাওয়ানি জুটমিলসের ক্রয়কেন্দ্র। এমনকি গত বছর (২০১৮) পর্যন্ত জনতা জুটমিলস নামের বেসরকারি একটি পাটকলের ক্রয়কেন্দ্রও বেড়ায় ছিল। অথচ চলতি বছরে আমিন জুট মিলস ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বাকি সব পাটকলের ক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।

বেড়ার পাট ব্যবসায়ীরা জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো পাট সংগ্রহ করার পর পাট ব্যবসায়ীদের বকেয়া ঠিকমতো পরিশোধ করেনি। ফলে পাট ব্যবসায়ীরা ওই পাটকলগুলোতে পাট দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে পাট না পেয়ে ক্রয়কেন্দ্রগুলো গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। আমিন জুটমিলসের বেড়া ক্রয়কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে বেড়া ক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে পাটকলটি ৬২ হাজার মণ পাট সংগ্রহ করবে। পাটকলটি বেড়ায় পাট কেনা শুরু করে নির্ধারিত সময়ের দুইমাস পরে। চলতি বছরের ৮ নভেম্বর পর্যন্ত পাটকলটি বেড়া ক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মাত্র ছয় হাজার মণ পাট সংগ্রহ করতে পেরেছে। পাট ব্যবসায়ীদের কাছে গত চার বছরে চার কোটি ৪৩ লাখ ১৩ হাজার ৫২১ টাকা বকেয়া থাকায় ব্যবসায়ীরা ক্রয়কেন্দ্রটিতে পাট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানা গেছে।

বেড়া বাজারের পাটব্যবসায়ী শামসুল ইসলাম বলেন, আমিন জুটমিলসের কাছে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গত বছরের প্রায় ৭৩ লাখ টাকা বাকি পড়ে আছে। বাকি পড়ে থাকা বেশির ভাগ টাকাই ব্যাংক থেকে এবং অন্যান্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়া। এভাবে বকেয়া পড়ে থাকায় আমাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন করে ক্রয়কেন্দ্রে কীভাবে আমরা পাট দেব? বকেয়া টাকা না পেলে আমাদের পথে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।

আমিন জুটমিলসের বেড়া ক্রয়কেন্দ্রের পাট ক্রয় কর্মকর্তা এখলাসুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। অথচ আমরা চলতি বছরে বিজেএমসির কাছ থেকে মাত্র ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছি। এ অবস্থায় পাওনা শোধ করতে না পারায় আমরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট পাচ্ছি না। আমাদের পাটকলের বিশাল গুদাম প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে।

সরেজমিনে বেড়া ও সাঁথিয়ার কয়েকটি পাট বিক্রির হাট ঘুরে দেখা যায়, প্রতিমণ পাট এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি বিজেএমসির ক্রয়কেন্দ্র কমে যাওয়ায় ও সেখানে পাট বিক্রিতে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণে এমন দামে পাট বিক্রি হচ্ছে। তা না হলে প্রতি মণে আরো অন্তত ২০০ টাকা বেশি দরে কৃষকেরা পাট বিক্রি করতে পারতেন।

"