নিষেধাজ্ঞার সময়েও চলছে ইলিশ শিকার

ঝালকাঠি ও বেলকুচিতে অসাধু জেলেদের আধিপত্য

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

ঝালকাঠি ও বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি

মা ইলিশ রক্ষায় নিধনবিরোধী অভিযানে তৎপর রয়েছেন জেলা-উপজেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদফতর ও পুলিশ বিভাগ। কিন্তু ঝালকাঠির সুগন্ধা-বিষখালি নদীর জেলেরা প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ শিকারের নিষেধাজ্ঞা মানছেন না মৌসুমি জেলেরা। এদিকে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার যমুনা তীরের প্রায় ১৯ কিলোমিটার জুড়ের মা ইলিশ শিকার করছে জেলেরা। এ জন্য অর্থের বিনিময়ে তারা প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আশ্বিনের পূর্ণিমার আগের ৪ দিন ও পরের ১৮ দিনসহ মোট ২২ দিন (৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর) পর্যন্ত মা ইলিশ নিধন রক্ষা করতে ইলিশ নিধন, পরিবহন, মজুদ ও ক্রয়-বিক্রয়ে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।

আমাদের ঝালকাঠি প্রতিনিধি শাহাদাত হোসেন মনু ও সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা প্রতিনিধি জুুবায়েল হোসেনের পাঠানো খবরÑ

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, জেলার সুগন্ধা ও বিষখালি নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিনই সকাল থেকে দুপুর দেড়টা বিষখালি নদীতে সকাল সাড়ে ১১টা ও সোয়া ১২টার দিকে গজালিয়া ও হদুয়া এলাকায় ৩০টিরও বেশি নৌকায় কারেন্ট জাল দিয়ে মা ইলিশ শিকার করা হয়।

নলছিটি উপজেলার পালট গ্রামের জেলেরা অভিযোগ করেন, সরকারি তালিকাভুক্ত জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মানলেও মৌসুমি জেলেরা নদী থেকে ইলিশ ধরে গ্রামে গ্রামে গোপনে বিক্রি করে যাচ্ছে। ফলে তালিকাভুক্ত জেলে পরিবারগুলোর দিন কাটে খেয়ে না খেয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, নলসিটির মানকি, সুন্দর, নাপিতেরহাট ও বাদুরতলা এলাকার জেলেদের কাছ থেকে উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মচারীকে প্রায় ৬০ জনের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা করে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর বিনিয়য়ে অভিযান পরিচালনায় নিয়োজিত কর্মচারীরা ম্যাসেজ, কল ও ফেসবুকে ছবি দিয়ে অভিযানের গতিবিধি ও লোকেশন জানিয়ে দেয়। যাতে অভিযানকে ফাঁকি দিয়ে মাছ শিকার চালিয়ে যেতে পারে।

নলসিটি উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, জনবল কম, নিজস্ব বাহন না থাকা এবং নদীতে দ্রুতগতির বাহন ব্যবহার করার সুযোগ না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির জেলেরা মাছ শিকার করছে। মৎস্য কর্মকর্তা রমনি কান্ত মিন্ত্রী জানান, দূরত্ব ও দুর্গম হওয়ায় ওইসব এলাকায় অভিযানে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে, এ সুযোগে কিছু মাছ করছে, তবে অভিযান চলমান রয়েছে।

রাজাপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল বাসার জানান, নদীর তীরে ছোট ছোট ক্যানেল থাকার কারণে অভিযান দেখে ক্যানেলে ঢুকে পড়ে। আর ক্যানেলে ঢোকা যায় না, কারণ ক্যানেলে অভিযান চালাতে গেলে জেলে ও তাদের লোকজন দাও পড়ে এবং ইটপাটকেল মারে। এই উপজেলার ইউএনও সোহাগ হাওলাদার জানান, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নিধন রোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।

জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বাবুল কৃষ্ণ ওঝা জানান, অভিযযানের কিছু অসাধু জেলে এবং সেই সঙ্গে কিছু মৌসুমি জেলে রয়েছে তারা আইন অমান্য করে ইলিশ নিধন করছে। আমরা পাহাড়া দিচ্ছি জেলেদের, আর ওইসব জেলেরা পাহাড়া দিচ্ছে আমাদের।

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) উপজেলা প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার উত্তরে সদিয়া চাঁদপুর ইউনিয়নের বোয়ালকান্দি ও দক্ষিণে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের পাথরাইল পর্যন্ত যমুনা নদীর প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকায় অবৈধভাবে চলছে মা ইলিশ শিকার। নদী পাড়ের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধির কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না ইলিশ শিকার। এই মাছ বেচা-কেনার জন্য প্রায় ১২টি পয়েন্টে বিভিন্ন সময়ে বসছে ভ্রাম্যমাণ বাজার। রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসব বাজারে সবচেয়ে বেশি ইলিশ বেচাকেনা হয়।

জানা যায়, বর্তমানে প্রতিটি জালে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে ধরা পড়ছে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি মা ইলিশ। এসব ইলিশ আকার ভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বড় আকারের ইলিশ প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

খাষপুখুরিয়ার নাম প্রকাশের অনিচ্ছু এক জেলে জানান, তারা নির্বিঘেœ ইলিশ মাছ ধরার জন্য নৌকা প্রতি ৩ হাজার টাকা হিসেবে একজন জনপ্রতিনিধিকে টাকা দিয়েছেন। এভাবে ৫০টি নৌকা থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান ও অফিসের ক্ষেত্রসহকারী শফিকুল ইসলাম জানান, মৎস্য অফিসের কেউ অনৈতিক সুবিধার সঙ্গে জড়িত না। আমরা অভিযানে ব্যস্ত আছি, অন্য কেউ আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকলে সেটা আমাদের কিছু করার নেই।

তবে চৌহালী ইউএনও দেওয়ান মওদুদ আহমেদ জানান, বিশাল যমুনা নদীতে একটি টিম নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য তারপরও মা ইলিশ রক্ষায় শতভাগ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

"