বিদ্যালয়ের সামনে পুকুর

সন্তানদের স্কুলে পাঠিয়ে শঙ্কায় থাকেন অভিভাবকরা

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

সবুজ হোসেন, নওগাঁ ও খোরশেদ আলাম, কালিয়াকৈর (গাজীপুর)

নওগাঁ চককালীদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। বারান্দা ঘেঁষে রয়েছে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর। এখানে ছোটখাটো দুর্ঘটনাসহ শিক্ষার্থী ডুবির ঘটনাও ঘটেছে। একই অবস্থা গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার টেকিবাড়ি চানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থী আসাই বন্ধ করে দিয়েছেন অভিভাবকরা।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, ১৯৭৩ সালে জেলার সদর উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নে স্থাপিত চককালীদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯০। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সাফল্যের সঙ্গে শিক্ষার আলো ছড়ালেও নানা সমস্যায় জর্জরিত বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ে নেই খেলার মাঠ। সেই স্থানে আছে মালিক মো. শহিদুল দপ্তরির ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর। কিছু দিন আগে পুকুর পাড়ের তালগাছ ভেঙ্গে পড়ার কারণে বিদ্যালয়ের অংশে ভাঙ্গন ধরে যায়। ফলে ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান।

বিদ্যালয়ের চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল নেই এবং নির্দিষ্ট খেলার মাঠ না থাকায় বারান্দায় খেলাধুলা করে শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় তাদের খেলার সামগ্রীগুলো পুকুরে পড়ে যায়। এ কারণে ঘটতে পারো বড় দুর্ঘটনার। কয়েকদিন পূর্বে মিতু নামের একজন তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র ওই ভাঙ্গা স্থানে পরে গিয়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়।

শিক্ষার্থীরা জানায়, বারান্দায় খেলাধুলার সময় বল বা খেলনা পুকুরে গেলে নানা রকম হুমকি-ধামকি প্রদানসহ পুকুর মালিকের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তবে পুকুর মালিক প্রভাবশালী হওয়ায় এর প্রতিবাদ করেও কোন সুরাহা মিলেনি। উল্টো শিক্ষক ও অভিভাবকদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মিম খাতুন বলে, ‘আমাদের খেলার মাঠ নেই, তাই বারান্দায় খেলি। অনেক সময় পুকুরে খেলনা পরে যায়। সেটা আনতে একদিন আমাদের এক বান্ধবী পুকুরের পানিতে ডুবে গিয়েছিল। পরে স্যারেরা তাকে উদ্ধার করে। মাঠ না থাকলে আমরা খেলব কোথায়?’

স্থানীয় অভিভাবক ইমরান হোসেন জানান, বিদ্যালয়টি অনেক পুরোনো, কিন্তু সে অনুয়ায়ি সার্বিক উন্নতি হয়নি। দূর-দূরান্ত এখানে অনেক কোমলমতি শিশুরা পড়তে আসে। কিন্তু স্কুলটির নেই সিমানা প্রাচীর, নেই কোন খেলার মাঠ। এভাবে পাঠদান সম্ভব নয়। শিশুরা পাশের পুকুরে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। , ‘স্কুলটি সন্তানদের জন্য নিরাপদ নয়’ উল্লেখ করে আরেক অভিভাবক পারভীন বানু বলেন, ‘স্কুলে খেলার মাঠ নেই। যেটুকু পারে বারান্দায় খেলে। তাও আবার কোনোকিছু পুকুরে পরলে পুকুরের মালিকরা মারধর করে। এত সমস্যা হলে কিভাবে স্কুলে পাঠাবো, বলেন?

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মরজিনা বেগম বলেন, ‘পুকুর মালিকদের অনেকবার অনুরোধ করেছি। যদি একটু সংস্কারের উদ্যোগ নিতেন তাহলে আমরা সাধ্যমত এগিয়ে আসতাম, কিন্তু তারা কোন সহযোগিতা করেনি। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ফান্ড না থাকায় সংস্কার কাজ করাও সম্ভব হচ্ছে না।’ এজন্য জেলা শিক্ষা অফিস বরাবর লিখিত দরখাস্ত করেছেন বলে তিনি জানান।

এ বিষয়ে কথা বলতে বিদ্যালয় সংলগ্ন পুকুর মালিক শহিদুল দপ্তরির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিদ্যালয়ের সমস্যার কথা স্বীকার করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম মন্ডল প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, ‘একটি লিখিত দরখাস্ত পেয়েছি। কিন্তু বর্তমানে সংস্কারের জন্য কোন প্রকল্প নেই, তবে প্রকল্প বরাদ্দ পেলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অবশ্যই নেওয়া হবে।’

এদিকে কালিয়াকৈর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেখানে থাকার কথা ছিল শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ, সেখাই খনন করা হয়েছে মসজিদের পুকুর। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত এখানেই ঝুঁকি যাতায়াত-পড়ালেখা করছে।

সরেজমিন দেখা যায়, বিদ্যালয়ে যাওয়া নির্দিষ্ট কোন রাস্তাও নেই। ফলে পুকুর পাড় ব্যবহার করে চলাচল করে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের বারান্দাটুকুই তাদের খেলার মাঠ। সাঁতার না জানা এসব শিক্ষার্থী যেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গেই খেলা করছে। স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘদিন যাবত এমন অবস্থা চলে আসছে। বিদ্যালয়ের জায়গা না হওয়ায় এই পুকুরটি ভরাট করাও সম্ভব হচ্ছে না। এটি স্থানীয় জামে মসজিদের সম্পত্তি। পুকুরটি ভরাট করা হলে একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠ হবে, ঈদগা মাঠ হবে বলেও জানান তারা। এলাকার মালেক মিয়া জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য পুকুরটি একটা আতঙ্ক। এটা ভরাট করে মাঠ তৈরি করা খুবই দরকার।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সাদেক আলী প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, এ ব্যাপারে আমরা আবেদন করেছি, কোন কাজ হয় নি। জায়গাটা পাশের মসজিদের। আমরা ভরাট করতে পারি না। নেতৃস্থানীয়দের বলেছি তাতেও লাভ হয়নি।’

জানতে চাইলে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার রমিতা ইসলাম বলেন, আমি এরকম ঘটনা জানি না। আমাকে কেউ জানায় নি। আমি দেখতে যাব, তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

 

"