হবিগঞ্জে দখলে বিলীন পুরাতন খোয়াই নদী

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

হবিগঞ্জের পর দিয়ে বয়ে যাওয়া আন্তঃসীমান্ত খোয়াই নদীর দুই পাশে অবৈধ দখলের বিস্তার ঘটেছে। শহরের পৌর বর্জ্যরে সঙ্গে স্থানীয় বিপণির ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলায় দূষিত হচ্ছে পানি। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি হারিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে অস্তিত্ব।

নদীর উৎস অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের ত্রিপুরার আঠারমুড়া পাহাড় থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি সিলেটের বাল্লা নামক স্থান দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদীটি হবিগঞ্জ জেলার পূর্বপ্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিশেছে। উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নদীটির দৈর্ঘ্য ৯১ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১০৬ মিটার।

হবিগঞ্জের দুঃখ হিসেবে পরিচিত খোয়াই নদীকে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে ১৯৭৮-৭৯ সালে শহর থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার বাইরে নেওয়া হয়। এরপর থেকে নদীর শহরের অংশ পরিচিত হতে থাকে ‘পুরাতন খোয়াই নদী’ নামে। সত্তর দশকের শেষে নদী বাইরে নিয়ে যাওয়ার এরপর থেকে পুরাতন খোয়াইয়ের দুই পাড় দখলদারদের দৃষ্টি পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, শহর রক্ষার জন্য ৭০-এর দশকের শেষে মাছুলিয়া-রামপুর ও খোয়াই মুখ-গরুর বাজার পর্যন্ত দুই দফায় ৫ কিলোমিটার লুপ কাটিংয়ের মাধ্যমে খোয়াই নদীর গতি পরিবর্তন করে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত করে দেওয়া হয়।

তিন বছরে আগে ২০১৬ সালে জেলা প্রশাসনের এক হিসেবে দেখা গেছে, শহরের মাছুলিয়া থেকে হরিপুর পর্যন্ত পুরাতন খোয়াই নদীর দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার। আর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা ৫ শতাধিক। দখলদারের অবৈধ দখল করা জমির পরিমাণ প্রায় দুই একর। অথচ কয়েক বছর আগেও যে নদীতে পানি ছিল সেখানের বর্তমান চিত্র দেখলে মনে হবে কোনো সময় ওই জায়গায় নদীর কোন চিহ্ন ছিল না।

সরেজমিনে নদী অববাহিত ঘুরে দেখা যায়, পুরাতন খোয়াই নদীর দুইপাশ দখল করে বাড়ি-ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। মাঝে মধ্যে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যাপক তোড়জোর নিয়ে মাঠে নামলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অভিযানের সময় নদীর পাড়ে অবৈধ ভাবে গড়ে উঠা কিছু কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও মাস ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও দখল হয়ে যায় ওই স্থানগুলো।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এ মাসের যে কোন দিন থেকেই অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। এ লক্ষ্যে তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। দেখা যায় পুরাতন খোয়াই নদীর অধিকাংশ জায়গায় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। নির্মাণ করা হয়েছে চলাচলের রাস্তা। সব কিছুই তালিকায় লিপিবদ্ধ করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তালিকা প্রায় শেষপর্যায়ে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, তালিকা করতে গিয়ে দেখা গেছে উচ্ছেদ অভিযানে বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। সব জটিলতা কাটিয়ে এ মাসেই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করব। উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার পূর্বে সংবাদ সম্মেলন করে উচ্ছেদের সার্বিক দিক সাংবাদিকদের জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

উচ্ছেদ পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জেলা প্রশাসক জানান, শহরের পুরাতন খোয়াই নদীর আড়াই কিলোমিটার এলাকাকে নান্দনিক করাসহ ‘খোয়াই রিভার সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়নে ১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকার যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল তা সংশোধিত হয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেলে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশাবাদী।

বাপা ও পুরাতন খোয়াই নদীরক্ষা কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন সময় নদী দখলকৃত সীমানা চিহ্নিতকরণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণের দাবিতে গণসমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করে থাকে। এ বিষয়ে হবিগঞ্জ বাপার সম্পাদক তোফাজ্জুল সোহেল জানান, পুরাতন খোয়াই নদীটি একসময় হবিগঞ্জবাসীর ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় নদীটি হারিয়ে যেতে বসেছে।

দখল হয়ে গেছে নদীর বেশির ভাগ অংশ। তাই এখনই নদীটি দখলমুক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যতে হয়তো পুরো নদীটিই দখল হয়ে যাবে।

ণরুদ্ধারের জন্য জোরদাবী জানান তিনি।

 

"