ট্যানারি মালিকের কাছে পাওনা ৬ কোটি টাকা

নওগাঁয় চামড়া কেনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

সবুজ হোসেন, নওগাঁ

ঈদুল ফিতরে কোরবানির পশুর চামড়া কেনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নওগাঁ জেলাা ব্যবসায়ীরা। বিগত ৫ বছরে ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রায় ৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। এতে চামড়া কেনায় নতুন বিনিয়োগের মতো টাকা হাতে নাই। ইতোমধ্যে অনেক চামড়া ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসা শুরু করেছেন। বাজারে চামড়ার দাম কম হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে তারা বলছেন, এ বছর চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

নওগাঁ শহরের গোস্তহাটির মোড় থেকে দক্ষিণে দুবলহাটি রাজবাড়ী যাওয়া রাস্তায় হাট-নওগাঁ মহল্লা। এক সময় হাট-নওগাঁর এ রাস্তায় ‘চামড়া পট্টি’ নামে পরিচিত ছিল। অনেক দুর পর্যন্ত বাতাসে সেই চামড়ার গন্ধ ভেসে যেত। এদিকে ‘চামড়া পট্টি’ ব্যবসায়ীরা লোকসানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অন্য পেশা বেঁছে নিয়েছেন। এখনো এই রাস্তা ‘চামড়া পট্টি’ নাম থাকলে হলেও সেখানে এখন মুদি, সাইকেল, সিরামিক, প্লাস্টিক সামগ্রীর দোকানের বাহার দেখা গেছে। কোরবানি ছাড়া ওই এলাকায় তেমন চামড়া দেখা যায় না।

ব্যবসায়িরা জানান, জেলায় ছোট-বড় মিলে প্রায় ২০০ চামড়া ব্যবসায়ী রয়েছে। এসব ব্যবসায়ীরা কোরবানির সময় এলে ধারদেনা করে চামড়া কিনেন। অথচ দফায় দফায় সময় নিয়েও বিগত বছরের পূর্বের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। ট্যানারি মালিকরা টাকা পরিশোধ না করে বিভিন্ন অজুহাত দেখান। ফলে এবছর চামড়া কেনা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, চামড়া কেনার জন্য আগাম কিছু প্রস্তুতি থাকে। অর্থ যোগান, লবণ সংগ্রহ, দা ও ছুরি এবং শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া। এ জন্য তাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া হয় না। ঋণ দেওয়া হয় ট্যানারি মালিকদের। কিন্তু ট্যারানি মালিকরা চামড়া কিনে নিয়ে যাওয়ার পর বলা হয় নষ্ট হয়ে গেছে। যে দামে তারা কিনে নিয়ে যান, পরিবর্তীতে বলা হয় দাম কমে গেছে। এ জন্য কম দাম নিতে হবে। ট্যানারি মালিকদের কাছে তারা জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে তারা অভিযোগ করেন।

চামড়া ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন খান বলেন, দীর্ঘ ৪৭ বছর থেকে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গত ৫ বছর থেকে এ ব্যবসায় দুর্দিন দেখা দিয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কাছে প্রচুর টাকা বকেয়া আছে। আগামীতে কোরবানির চামড়া কেনার প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত নিতে পারিনি। তিনি অভিযোগ করেন, যাদের চামড়া দেওয়া হয়েছে ফোন দিলে রিসিভ করেন না। আবার ঢাকাতে যাওয়া হলে যে ২ হাজার টাকা খরচ হয় সেটাও তারা দেন না। শুধু হয়রানি করেন।

বংশগতভাবে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সাবেক কোষাধ্যক্ষ সাদেক হোসেন। প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে প্রায় ২১ লাখ টাকা পাওনা আছি। দু-একজন দেশের বাইরে চলে গেছেন। চামড়া যে কিনব হাতে কোন টাকা পয়সা নাই। দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।

চামড়া ব্যবসা ছেড়ে মুদি দোকান করছেন সাইদ হোসেন। তিনি বলেন, আমি প্রায় ২৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছি। ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছি। আমার মতো অনেকেই এখন জীবিকার জন্য ব্যবসা পরিবর্তন করেছে।

নওগাঁ শহরের হাট-নওগাঁ মহল্লার ইট ব্যবসায়ী এটিএম আলমগীর হোসেন বলেন, ১৯৭৫-৭৬ সালের দিকে চামড়া ব্যবসা রমরমা ছিল। কোরবানির সময়ে চামড়ার গন্ধে এ রাস্তা দিয়ে হাঁটা যেত না। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকেও ভাল ছিল। বর্তমান বাজারে এসে চামড়া নেই। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় তারা এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সরকারের এদিকে নজর দেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

নওগাঁ জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি মোমতাজ হোসেন বলেন, আমরা চামড়া ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে গত ৫ বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকা পাওনা আছি। চামড়ার টাকা বকেয়া থাকায় এ বছর চামড়া কেনার কোন প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি। এ বছর ২৫ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। কারণ বাজারে চামড়ার দাম কম। ভারতে চামড়ার দাম ভাল, অথচ আমাদের দেশে দাম নাই। তিনি বলেন, চামড়ার ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ‘ওয়েট ব্লু’ করে চামড়া রপ্তানি করার জন্য সরকারকে অনুমোতি দিতে হবে। তা না হলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

এই ব্যবসায়ি নেতা অভিযোগ করেন, কয়েকজন ট্যানারি মালিক আছেন, যারা কম দামে চামড়া কিনে বেশি দামে জুতা বিক্রি করেন। চামড়ার দাম ভাল না পাওয়ায় এবং পাওনা টাকা না পাওয়ায় অনেক পুরনো চামড়া ব্যবসায়ী আজ পুজি হারিয়ে পথে বসেছেন।

 

"