মহাকবি কায়কোবাদের ৬৮তম প্রয়াণ দিবস

বেদখল কবির জন্মভিটা তৈরি হয়নি জাদুঘর

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

ইমরান হোসেন সুজন, নবাবগঞ্জ (ঢাকা)

‘মহাশ্মশান’ মহাকাব্যের জন্য বাংলা সাহিত্যে অবিস্মরণীয় মহাকবি কায়কোবাদ। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া এই মহাকবিকে নিয়ে দেশ-বিদেশে সাহিত্য বোদ্ধাদের মাঝে সমাদৃত হলেও, নিজ জন্মভিটার মানুষের কাছেই যেন উপেক্ষিত তিনি। দখল হয়েছে তার জন্মভিটা, ভেঙে ফেলা হয়েছে কবির নামে করা রাস্তার ফলক। বন্ধ হয়ে গেছে কবির নামে করা গণপাঠাগার। এতে স্থানীয়ভাবে কবির নাম জানলেও তার বিপুল সৃষ্টির কথা কমই জানে মানুষ। গতকাল রোববার ছিল মহাকবির প্রয়াণ দিবস। ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই পরলোকগমন করেন তিনি।

কবির জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৮৫৭ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন মহাকবি কায়কোবাদ। ‘কায়কোবাদ’ নাম পরিচিত হলেও তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী। তার পিতা ঢাকা জেলা জজ কোর্টের আইনজীবি শাহামাতুল্লাহ আল কোরাশী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৮৭০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশ হলে বাংলা সাহিত্যঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে ১৯০৪ সালে মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ প্রকাশের পর ‘মহাকবি’ উপাধি লাভ করেন তিনি। কবিতা লেখার পাশাপাশি দীর্ঘদিন আগলা ডাকঘরে চাকরি করেছেন তিনি।

মহাকবির বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজ গ্রামে কবির স্মৃতি চিহ্ন বলতে তেমন কোন কিছু এখন আর অবশিষ্ট নেই। এখন মহাকবির ব্যবহ্নত একটি ভাঙা ঘর ও একটি আম গাছ ছাড়া আর কিছুই নেই কবির স্মৃতি হিসেবে। কবির জন্মভিটা এলাকায় রান্নার কাজে ব্যস্ত এক গৃহিনী বলেন, কবির কোনো চিহ্ন এখন আর ওই বাড়িতে নেই। কবির বংশধররা সম্পূর্ণ জমি বিক্রি করে চলে গেছেন বলে তিনি দাবি করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কবির বংশধররা কিছু জমি বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশিরা সম্পূর্ণ জমিই দখল করে নিয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৬ সালে জেলা পরিষদের উদ্যোগে কবির বাড়ির সামনের রাস্তাটি কবির নামে নামকরণ করে একটি ফলক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ফলকটি রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলেছে। ফলে রাস্তাটি যে কায়কোবাদের নামে করা হয়েছে সেটিও অনেকে জানে না। এমনকি কবির নামে করা ‘কায়কোবাদ চত্ত্বরের’ ফলক ভেঙে তৈরি করা হয়েছে ‘স্বাধীনতা চত্তর’।

এছাড়া ১৯৭২ সালে সাবেক এমপি সুবিদ আলী খান কবির সম্মানার্থে তার কর্মস্থল আগলা ডাকঘর সংলগ্ন জমিতে কায়কোবাদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া কবির বাড়ির পশ্চিমে ১৯৮৩ সালে আগলা মাছপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত করা হয় কায়কোবাদ যুব ক্লাব ও গণপাঠাগার। গত ১০-১২ বছর ধরে পাঠাগারটির সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কোন দর্শনার্থী আগলা গ্রামে গেলে কবি সর্ম্পকে কিছ্ইু জানতে পারেন না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মহাকবি শুধু আগলা না নবাবগঞ্জের গর্ব। তবে আমরা তাকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারি না। কবির সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম কিছুই জানে না। নিজ ভূমিতেই কবি আজ অবহেলিত।

কায়কোবাদের নাতি টুটুল আলম কোরেশী বলেন, কবির বাড়িটি দখলমুক্ত করে কবির নামে একটি পাঠাগার ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হলে তার সর্ম্পকে নতুন প্রজম্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। মহাকবি কায়কোবাদ নবাবগঞ্জের গর্ব।

কবির বাড়ির সামনে যে মসজিদের আযান শুনে ‘আযান’ কবিতাটি লিখেছিলেন, সেটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলা ১৩০০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার মজিদ মিয়া। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা কাজল চৌধুরী বলেন, এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়তেন কবি কায়কোবাদ। মহাকবিকে মূল্যায়ন করতে না পারাটা আমাদের জন্য লজ্জার।

স্থানীদের দাবির প্রেক্ষিতে বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাকিল আহমেদ এক অনুষ্ঠানে কবির নামে পূর্ণাঙ্গ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে ছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত এই বিষয় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে নি স্থানীয়দের। জানতে চাইলে উপজেলার বর্তমান ইউএনও সালাউদ্দিন মঞ্জু প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আমি উপজেলায় সদ্য যোগ দিয়েছি। এখন পর্যন্ত কবির জন্মভিটা পরিদর্শন করিনি।’ কবির নামে করা রাস্তা ও চত্তরের ফলক অপসারণ বিষয়ে অবগত নন বলে জানান এই কর্মকর্তা। একইভাবে বিগত ইউএনও ঘোষিত জাদুঘর করার উদ্যোগ বিষয়েও তিনি অবগত নন। তবে মহাকবিকে নিয়ে তার প্রকল্প প্রস্তাবের বিষয় জানা যায়নি।

এদিকে কবির ৬৮তম প্রয়াণ দিবসে গতকাল দুপুরে উপজেলার চৌকিঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আলোচনার সভা আয়োজন করে মহাকবির কায়কোবাদ স্মৃতি পরিষদ। সংগঠনের সভাপতি আবুল কালাম মল্লিকের উদ্বোধনে সভার সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের সভাপতি আব্দুর রহমান লেবন। এতে বক্তব্য দেন কবির নাতি মো. নাজিম আল কোরেশী, সমাজকর্মী আব্দুস সোবাহান, বেলায়েত হোসেন স্বাধীন, সংগঠনের সম্পাদক শেখ আরশাদ আলী, যুগ্ম-সম্পাদক শওকত আলী রতন, সদস্য মো. শাহীন প্রমুখ।

"