ঠাকুগাঁওয়ে ভেসে গেছে বিকল্প রাস্তা

প্লাস্টিকের ড্রামের ভেলাই লক্ষাধিক মানুষের ভরসা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

আল মামুন জীবন, বালিয়াডাঙ্গী (ঠাকুরগাঁও)

তিনদিনের টানা বর্ষণে ভেসে গেছে নির্মাণাধীন সেতুর বিকল্প রাস্তা। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আসা-যাওয়া। জেলার ঐহিত্যবাহী লাহিড়ী হাটে আসতে হচ্ছে ড্রাম ও বাঁশের তৈরি ভেলায় পার হয়ে। চলতি সপ্তাহের শুরুর তিন দিনে ভেঙে যায় বিকল্প রাস্তা। গত ৫ দিন ধরে ১০ টাকার বিনিময়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে লাহিড়ী জিসি-কালমেঘ জিসি ভায়া দোগাছি হাট রাস্তায় ছোট সিংগিয়া খালের উপর ১০৩৬ মিটার চেইনেজে সেতু নির্মাণ হচ্ছে। ৩ কোটি ৭২ লাখ ৪১ টাকা ব্যয়ে ৫৪ মিটার আরসিসি গার্ডারের এই সেতুর নির্মাণ শুরু হয় চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি। পুরাতন লোহার সেতুটি ভেঙ্গে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ ২০২০ সালের জানুয়ারী মাসে শেষ হবার কথা। মি. রাম বাবু নামে ঠাকুরগাঁওয়ের একজন ঠিকাদার সেতুটি নির্মাণ করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরাতন সেতু ভেঙ্গে নতুন সেতুর কাজ শুরু হয়েছে বর্ষার মাস খানেক পূর্বে। পাইলিংয়ের কাজ শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। লোহার সেতুটি ভাঙ্গার সময় পথচারীদের জন্য যে বিকল্প রাস্তাটি তৈরি করা হয়েছিল বর্ষার শুরুতেই সেটি পানিতে ভেসে গেছে। পথচারীরা বাইসাইকেল, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে ঝুঁকির নিয়ে ড্রামের ভেলায় পার হচ্ছেন। এ জন্য তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ।

এদিকে দৈনিক এই রাস্তা দিয়ে ২ হাজারের অধিক মানুষ যাতায়াত করেন। সপ্তাহের সোম ও শুক্রবার লাহিড়ী বাজারের হাটের দিন ওই ড্রাম পার হয়ে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ হাটে আসেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী লাহিড়ী বাজারে আগামী শুক্রবার থেকে শুরু হবে ঈদ-উল-আযহার পশু ক্রয়-বিক্রয়। প্রতি বছর ওই বাজার থেকে জেলার অধিকাংশ মানুষ কোরবানীর পশু ক্রয় করে থাকেন।

স্থানীয়রা বলেন, দ্রুত সময়ে সেতুর পাশে চলাচলের জন্য বিকল্প রাস্তাটি তৈরি না করা হলে বিপাকে পড়বে হাটুরে। এজন্য সদর উপজেলার আখানগর, রুহিয়া, ভেলাজান এবং বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার দোগাছি মধুপুর, কাচনা মধুপুর, ফটিয়াপাড়া, সনগাঁও, ছোট সিঙ্গিয়া, ছোট লাহিড়ী, খালিপুরসহ প্রায় ৫০টির বেশি গ্রামের মানুষকে ৮-১০ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে লাহিড়ী হাটে যাতায়াত করতে হবে।

সদর উপজেলার আখানগর থেকে আসা পথচারি রফিকুল ইসলাম বলেন, ভেলায় চড়ে সকাল থেকে পারাপার করতে ২৫ টাকা দিয়েছি। বাড়ী ফেরা সময় ৫ টাকা আরো দিতে হবে। এমন ভাবে চলতে থাকলে এবার কোরবানী পশু অন্য বাজার থেকে ক্রয় করতে হবে।

পারাপার সংকটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা বন্ধ হয়ে গেছে লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, লাহিড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, লাহিড়ী ফাজিল মাদরাসাসহ আশপাশের প্রায় ১০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের। গুরুগৃহ থেকে ৭ম শ্রেণির ছাত্রী মিতু আক্তার বলেন, বাড়ী থেকে ভয়ে স্কুলে এবং প্রাইভেটে আসতেই নিষেধ করছে। ভেলা দিয়ে পার হতে ভয় লাগে। কিন্তু স্কুলে আর প্রাইভেটে না আসলে পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়বো।

উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের পারদেশী পাড়া গ্রামের করিমুল ইসলাম (৩৫) জানান, আমিসহ আমার ছোট ভাই সাদেকুল ইসলাম, চাচাতো ভাই রহিম উদ্দীন, ভাতিজা নুর মোহাম্মদসহ ৭-৮ জন এখানে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পারাপারের কাজ করছি। তবে অনেকেই ভয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ৬ কিলোমিটার পথ ঘুরে যাচ্ছেন। গত সোমবার সারাদিন প্রায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে পারাপার করেছেন, এজন্য জনপ্রতি ৫ টাকা হারে নিচ্ছেন বলে স্বীকার করেন তারা। তবে করিমুলের ভাই সাদেকুল ইসলাম জানান, স্থানীয় কয়েকজন পথচারীদের পারাপার করতে যে টাকা উঠে, সেটি ভাগ নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছিল। আমরা বিষয়টি পাত্তা দেইনি।

উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিলিপ কুমার চ্যাটার্জী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সেতুটি নির্মাণের শুরু থেকে ঠিদাকার, স্থানীয় প্রকৌশলী ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবগত করেছি। বর্ষা মৌসুমে এমন দুর্ভোগের শুরু হবে এটা আমি আগেই ধারণা করছিলাম। আমি ইউপি চেয়ারম্যান, আইন শৃংখলা সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা ছাড়া আমার আর কোন করার নেই।

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী মি. রামবাবুর মুঠোফোনে একাধিকার যোগাযোগ করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা প্রকৌশলী মাইনুল ইসলাম জানান, পানি একটু কমলেই বিকল্প রাস্তাটি পুনরায় তৈরি করার জন্য ঠিকাদারকে বলা হয়েছে। রাস্তা পারাপারে স্থানীয় ৭-৮ জন ব্যক্তি বাঁশ ও ড্রাম দিয়ে ভেলা তৈরি করে পথচারীদের পারাপার করতে সহায়তা করছে। এ জন্য ৫-১০ টাকা করে নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

"