ঋণের চক্রে জিম্মি তানোরের নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মিজানুর রহমান, তানোর (রাজশাহী)

আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়ছেন নিম্ন-মধ্যবিত্তরা। সংসার চালাতে গিয়ে শুধু হিমশিম খেতে হচ্ছে এমনটাই নয়, রীতিমতো বিপাকে পড়ে আছে। আর ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা খরচসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। এক সময় যারা ব্যয় বহন করে সামান্য হলেও পুঁজি সঞ্চয় করতো। এখন তারা ঋণের টাকাও শোধ করতে পারছে না। ক্রমাগত দ্রব্য মূল্য বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু সে অনুযায়ী আয় বাড়েনি অনেকের। সম্প্রতি ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে তানোর উপজেলাসহ রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায়।

দারিদ্র বিমোচন স্লোগান নিয়ে এনজিওগুলো সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও জটিল রোগের ফ্রি চিকিৎসা সহায়তার মতো বিভিন্ন লোভনীয় কর্মসূচি থাকায় তানোর উপজেলায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো আকৃষ্ট হয়ে ঋণের দুষ্টচক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

ফলে উপজেলার নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো দারিদ্র বিমোচন না হয়ে এক বা একাধিক এনজিও’র ঋণের ফাঁদে আটকে পড়েছে। সর্বহারা ভূমিহীন কৃষক পরিবার নিয়ে কাজ করা এমন সংগঠনের দাবি এনজিওরা দারিদ্র বিমোচন করছেনা তৃণমূল মানুষের রক্তশোষণসহ ঘুম হারাম করে দিয়েছে। সরেজমিনে এ রকম চিত্রই পাওয়া যায়।

উপজেলা চাপড়া গ্রামের ঋণগ্রস্থ সিরাজুল-সফুরা দম্পতি। সিরাজুল পেশায় একজন অটো রিকশাচালক। বর্তমানে তার মোট ঋণ ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে তার কিস্তি মোট ৫ হাজার ৫০০ টাকা। এ ঋণগ্রহীতা অটো চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ টাকা হিসাবে সপ্তাহে মোট ২ হাজার ৮০০ টাকা আয় করেন।

এরমধ্যে চাল-ডাল, পান-সুপারিতে খরচ হয় ১ হাজার টাকা থেকে ১২শ’ টাকা পর্যন্ত। হাতে থাকে ১৬শ’-১৮শ’ টাকা। অটোচালক সিরাজুল সপ্তাহের আয়ের সব টাকা দিয়ে কিস্তি দিলেও পরিশোধ হচ্ছে না তার সাপ্তাহিক কিস্তি।

পার্শ্ববর্তী বাড়ির সাইদুর-সাহেদা দম্পতি। একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাদের আয়ের চেয়ে সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা বেশি হওয়ায় অন্য এনজিও থেকে নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরাতন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন।

উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও দুই পৌর এলাকার সাইদুর, সিরাজুল, সফুরাসহ শত শত নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। অপর দিকে ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে প্রতিবছর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

গত মাসে উপজেলার তালন্দ ইউনিয়নের এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক একাধিক এনজিও’র কিস্তি দিতে না পেরে ভিটে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসব নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একেক জন ১০-১২ লাখ টাকা ঋণী বলে জানা যায়।

এ উপজেলায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় অর্ধশত এনজিও দারিদ্র্যবিমোচনের স্লোগানে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া নামে বেনামে অনেক সংস্থা উচ্চ হারে সুদের উপর ঋণ প্রদান করছে অসহায় কৃষকদের।

স্থানীয় কয়েকটি এনজিও’র ওপর গত একসপ্তাহ ধরে জরিপ চালানো হয়। এসব এনজিওদের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে দারিদ্র বিমোচনের বিষয় কথা বললে তারা জানান, একজন ঋণী প্রথম ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে পুনরায় ঋণ নিয়ে থাকেন। এতেই ওই ঋণী আগের চেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এটাই হলো তাদের দারিদ্র বিমোচন।

তানোর পৌর সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক কবি অসিম কুমার সরকার বলেন, ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়াই হল দারিদ্র বিমোচন। বর্তমান অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে সরকার ও সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের সমন্বয় আর্থিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করলে অধিকাংশ লোক ঋণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

সরকারি তানোর আব্দুল করিম সরকার কলেজের প্রভাষক রাকিবুল সরকার পাপুল বলেন, এনজিওদের দারিদ্র বিমোচন স্লোগান কাগজপত্রেই রয়ে গেছে। তৃণমূল ভূমিহীন যারা এক সময় ঋণগ্রস্থ ছিল না এনজিও ঘরে ঘরে গিয়ে তাদেরকে সু-কৌশলে ঋণী করা হয়েছে। এনজিওরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তি টাকা আদায়ে করায় তাদের (ভূমিহীন দুস্থ মানুষ) আরামের ঘুম হারাম হয়েছে। কিস্তি আদায়ের জন্য থানা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয় ঋণ গ্রহীতাদের। এনজিওরা দারিদ্র বিমোচন করছে না বরং তৃণমূল মানুষের রক্ত শোষণ করছে।

 

"