মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু দিয়ে চলে ট্রেন

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট

১৮৫ বছরের লালমনিরহাটের তিস্তা রেলসেতু দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে লোকাল ও আন্তঃনগরসহ ১৮টি ট্রেন। দীর্ঘদিন থেকে পাশে আরেকটি সেতু নির্মাণে সরকারি পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। ফলে ঝুঁকি নিয়েই চলছে রেল।

যাত্রী ও স্থানীয়দের দাবি, সম্প্রতি সিলেটের কুলাউড়ার মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগেই কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে লালমনিরহাট রেলওয়ের কর্মকর্তার দাবি, তিস্তা রেলসেতু মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

১৮৩৪ সালে সারা দেশের সঙ্গে রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে রেল যোগাযোগ সৃষ্টি করতে তিস্তা নদীতে রেলসেতু নির্মাণ করে তৎকালীন বৃটিশ সরকার। এর দৈর্ঘ্য ২ হাজার ১১০ ফুট। তখন দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেলসেতু হিসেবে এটির পরিচিতি ছিল। সেতুটির উত্তর পাশে লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা এলাকার গোকুন্ডা, রাজপুর, খুনিয়াগাছ ও মহিষখোচা ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ পাশ যুক্ত হয়েছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সঙ্গে।

লালমনিরহাট রেলওয়ে অফিস সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, নির্মাণের সময় এ সেতুটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল একশত বছর। সে হিসেবে ৮৫ বছর আগে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে সেতুটি। তারপরও জোড়াতালি দিয়ে লোকাল ও আন্তঃনগর ট্রেনসহ ১৮টি ট্রেন ছুটছে এই সেতুর উপর দিয়েই।

এদিকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মিত্রবাহিনী বোমা বিস্ফোরণে সেতুর একটি গার্ডার মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরবর্তীতে ’৭২ সালে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সোনাহাট স্থলবন্দর সড়কে দুধ কুমড় নদীতে নির্মিত রেল সেতু (বর্তমানে এটি সড়ক পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে) একই গার্ডারে নির্মিত সেতু থেকে একটি গার্ডার এনে তিস্তা সেতুটি পুনরায় চালু করা হয়। ’৭৭ সালে রেলওয়ে ও সওজ বিভাগ যৌথভাবে রেলসেতুতে মিটারগেজ লাইনের পাশে ২৬০টি স্টিলের টাইফ প্লেট ও কাঠের পাটাতন স্থাপন করে। ১৯৭৮ সালে ট্রেনের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ শুরু করা হয়। তখন থেকেই সেতু দিয়ে ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করতো। সে সময় মাত্রাতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক পারাপারের ফলে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

সূত্র জানায়, ২০০১ সালে রেলসেতুর পূর্ব পাশে তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন এবং ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে তা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিš মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও সেতুর ওপর দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, অযতœ আর অবহেলায় সেতুটির লাইনে বেশ কিছু স্লিপার নষ্ট হয়েছে। খুলে পড়ে গেছে অনেক স্লিপারের প্লেট ও নাট-বল্টু। ফলে যে কোনো মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

তিস্তা রেল সেতু এলাকার বাসিন্দা মুকুল মিয়া, রিপন মিয়া, মিনার মাস্টার মোজাম্মেল হক প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, তিস্তা রেল সেতুটির ওপর ট্রেন উঠলেই সেতুটি কেঁপে ওঠে। ট্রেনটি সেতুর মাঝপথে গেলেই সেতুটি টলতে থাকে। সব সময় আমরা আতঙ্কের মধ্যে থাকি। কখন যে কি ঘটে। মাঝে মাঝে লোক দেখানো নামমাত্র সেতুর মেরামতের কাজ হলেও কোন উন্নতি ঘটেনি। যেকোনো সময় এখানে বড় ধরনের প্রাণহানীসহ মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ট্রেনের নিয়োমিত যাত্রী হান্নান আলী, কফিল উদ্দিন, বাদাম বিক্রেতা আব্দুস ছালাম ও ব্যবসায়ী লাল মিয়া প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, তিস্তা রেল সেতুতে ট্রেন উঠলে বুকটা কেঁপে উঠে। সেতুটি অতিক্রম না করা পর্যন্ত বুক কাঁপতে থাকে। এ সময় আল্লাহকে স্বরন করি ট্রেনটি কখন সেতু পার হয়। দীর্ঘ দিন ধরে জোড়াতালি দিয়ে সেতুটিতে ট্রেন চলাচল করছে।

সম্প্রতি তিস্তা রেলসেতু পরিদর্শন করে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেন, কানেক্টিভিটি বাড়াতে তিস্তা রেলসেতুতে ট্রেনের গতি ও ট্রেনের সংখ্যার বাড়ানো হবে। তাই তিস্তায় আরেকটি রেল সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরাতন সেতুর পশ্চিম পাশেই আরেকটি ডুয়েল গেজ সেতু নির্মাণে খুব দ্রুত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।

তবে এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হতাশ স্থানীয় যাত্রীসাধারণ। জানতে চাইলে লালমনিরহাট রেলওয়ের বিভাগীয় ম্যানেজার (ডিআরএম) মুহাম্মদ শফিকুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, গত ২৫ জুন একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিভাগের ছোটবড় ৪০৮টি সেতুর খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু সেতুতে ইতিপূর্বে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কোনো সেতু নেই। তিস্তা রেলসেতু মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবুও বর্তমান সরকারের তিস্তা রেলসেতুর পশ্চিম পাশে নতুন করে আরো একটি মিটার ও ব্রডগেজ ডুয়েল সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

"