ময়মনসিংহে অস্তিত্ব সংকটে তিন বড় নদী

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

মাজহারুল ইসলাম মিশু, হালুয়াঘাট (ময়মনসিংহ)

অস্তিত্ব সংকটে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ফুলপুর ও সীমান্তবর্তী শেরপুরের নালিতাবাড়ী দিয়ে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা কংশ, চন্দ্রাবতী ও কালা নদী। এসব নদীতে বিভিন্ন অংশে দেওয়া হয়েছে বাঁধ, নদীর উপর গড়ে তোলা হয়েছে বাড়িঘর। এতে করে বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। এতে বিপাকে পড়েছেন নদী পাড়ের লাখো মানুষ। বাঁধ সরিয়ে নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এলাকাবাসী এবং কৃষি কার্যালয় থেকে জানা গেছে, হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের মোকামিয়া, রামনগর, ঝাউগড়া, মাইজপাড়া ও ধনারভিটা, আমতৈল ইউনিয়নের বাহিরশিমুল হয়ে ফুলপুর উপজেলার সরচাপুর গিয়ে ভোগাই নদে গিয়ে মিশেছে কংশ নদী। এজন্য নদীটি পাড়ি দিয়েছে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার এলাকা। এর পার্শ্ববর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার মরিচপুরান ইউনিয়নে খলাভাঙা এলাকায় ভোগাই নদ থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে কংশ শাখা নদী। এই শাখা নদীর পানি দিয়ে হাজার হাজার কৃষক তাদের খেতে সেচ দিতেন। এ ছাড়া নদীর পানিতে গৃহস্থালির কাজ, গবাদিপশুর গোসল করানো সহ নানান কাজে এই নদের পানি ব্যবহার করতেন গ্রামবাসী।

২০১৬ সালে নদী শুষ্ক মৌসুমে পানি মজুত রাখতে খলাভাঙা এলাকায় কংশ ও ইছামতি নদীর সংযোগ মুখে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে স্লুইসগেটের দুই পাশের মাটির বাঁধ ভেঙে যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নদীর উৎস মুখ থেকে ২০০ মিটার ভাটিতে মরিচপুরান ইউনিয়নের খলাভাঙা এলাকায় আয়নাল হক, নাজমুল হক এবং আঞ্জুয়ারা বেগম নদ ভরাট করে বাড়িঘর তোলেন। ওই বছরের মার্চে এলাকাবাসী নদীতে দেওয়া বাঁধ সরানোর দাবি জানিয়ে নালিতাবাড়ীর ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

স্থানীয়রা জানান, অভিযোগে প্রেক্ষিতে মরিচপুরান ইউপি চেয়ারম্যান খন্দকার শফিক আহমেদকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন ইউএনও। প্রথম দিকে বাঁধ সরাতে জনপ্রতিনিধিরা উদ্যোগ নিলেও, পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীর ভাটির দুই পাড়ের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

খলাভাঙা এলাকার বাসিন্দা মকবুল হোসেন (৯০) প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, উজানে বাঁধ দেওয়ায় নদের ভাটি অঞ্চলের মানুষের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে ইতিমধ্যে ফুলপুর উপজেলার সরচাপুর অংশে কংশ নদীটির খনন শুরু হয়েছে।

একই অবস্থা বিরাজ করছে চন্দ্রাবতী নদীর। উজানে বাঁধ দেওয়ার ফলে এই নদীটি বর্তমানে ছোট ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এই নদী দেখলে বুঝার উপায় নেই এটি এক সময়ের খরস্রোতা নদী ছিল। চন্দ্রাবতী নদীপাড়ের বৃদ্ধ কৃষক আ. করিম (৮০) বলেন, চন্দ্রবতী নদীটি এক সময় এই এলাকার কৃষকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই নদী দিয়ে বড় বড় ট্রলার, নৌকা চলাচল করতো। নদীটি ছিল যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু বর্তমানে নদীটি হারিয়ে যেতে বসেছে। নদীটি দখল করে নিচ্ছে স্থানীয় দখলদারেরা। তিনি বলেন, নদীটি খনন করা গেলে হালুয়াঘাটের কন্নাপাড়া, পাবিয়াজুড়ি, দরাবন্নি, পূর্ব ও উত্তর ধুরাইলের কৃষকরা খুবই উপকৃত হবে। দখলের কারণে নদীটি বর্তমানে হুমকির মুখে।

এদিকে কালা নদীর অবস্থা একই। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে ময়মনসিংহে বেশ পরিচিত ছিল নদীটি। বর্ষা মৌসুমে এ নদী দিয়ে কাকচক্ষু পানি প্রবাহিত হতো। স্থানীয়দের ধারণা, কালো পানির কারণেই এ নদীর নাম ‘কালা’ রাখা হয়েছে।

অবাক করার বিষয় হলো, অন্য নদীর সঙ্গে পানি মিশতো না এর পানি। শুধু তাই নয়, নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কালা নদীর মাছ ছিলো খুবই সুস্বাদু। তবে এগুলো এখন কেবল স্মৃতি।

কালাপাড়ের কৃষক সালাম জানান, এই নদীটির একসময় খুব নাম ছিল। কিন্তু উজানে বাঁধ দেওয়ার ফলে এখন নদীটির হারিয়ে যেতে বসেছে। এই নদীটি খনন করা গেলে গোরকপুর, চর গোরকপুর, ডুবারপাড় সহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে।

হালুয়াঘাটের ধুরাইল ইউপির চেয়ারম্যান মো. ওয়ারিছ উদ্দিন সুমন বলেন, শুষ্ক মৌসুমে হালুয়াঘাট ও নালিতাবাড়ী উপজেলার নদী পাড়ের হাজার হাজার কৃষক তাদের জমিতে সেচ দিতে পারতেন। অনেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। নদীর উজানে বাঁধ দেওয়ায় সেই পানি বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁধ সরিয়ে খননের মাধ্যমে আবারও নদের নাব্যতা ফিরে আনার দাবি জানান তিনি।

 

"