তিন মাসেই ধসে পড়েছে মহাদেও তীর রক্ষা বাঁধ

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০

রিপন মিয়া, কলমাকান্দা (নেত্রকোনা)

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চিকুনটুপ এলাকায় সদ্যনির্মিত পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মহাদেও নদীরক্ষা বাঁধ ধসে পড়েছে। ২০১৮ সালে কার্যাদেশে প্রায় সোয়া ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে এর নির্মাণ শেষ হয়। নিম্নমানের কাজ হওয়ায় নদী সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের তিন মাসের মাথায় বাঁধটি ধসে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

গত বছর উপজেলার সীমান্তবর্তী চিকুনটুপ এলাকায় পাহাড়ি ঢলের আকস্মিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে মহাদেও নদী পাড় রক্ষা করার জন্য ২৮০ মিটার বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় জেলা পাউবো। এ জন্য ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করে তারা। এই কাজের দায়িত্ব পান মো. ফজলুল হকের সত্তাধিকারের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফজলুল এন্টারপ্রাইজ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই কাজ শেষ করেন ঠিকাদার।

সরেজমিনে গতকাল শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা যায়, মহাদেও নদীরক্ষা বাঁধে বাঁশ ও বালু বস্তা দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে টেকসই হয়নি তীর রক্ষাবাঁধ। পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সীমান্তবর্তী রংছাতী ইউনিয়নের চিকুনটুপ গ্রামের শতাধিক পরিবারের বসতঘর জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

এদিকে এ বছর আবারো পাহাড়ি ঢলের কারণে নদী ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বরুয়াকোনা বাজার, বিওপি ক্যাম্প, চিকুনটুপ গ্রামে ৩৫০ পরিবার বসত ঘর জমি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আতাউল হক গনি জানান, গত বছর ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৮০ মিটার বাঁধ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে নেত্রকোণার পাউবো। পরে নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার শিডিউল অনুযায়ী কোনো কাজ করেননি বলে জানান ওই ইউপি সদস্য।

এই জনপ্রতিনিধি অভিযোগ বলেন, বাঁশ ও বালু বস্তা দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। যার ফলে এ কাজ কোনো উপকারে আসেনি স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাছাড়া পাহাড়ি ঢলের কারণে ফের নদী ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বরুয়াকোনা বাজার, বিওপি ক্যাম্প, চিকুনটুপ গ্রামে ৩৫০ পরিবার বসত ঘর জমি।

ভুক্তভোগী চিকুনটুপের বাসিন্দা আব্দুর রব হাওলাদার জানান, সোয়া ১৬ লাখ টাকা বরাদ্দে ঠিকাদারি নিলেও প্রাক্কলন কাজ করেননি তারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তদারকি করেন নি। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে কাজ শেষ হওয়ার দুমাস পর পাউবো মহাদেও নদী সংরক্ষণ বাঁধ ধসে পড়ে।

বরুয়াকোনা বাজারের ব্যবসায়ী মো. মজনু মিয়া বলেন, অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ হওয়ায় সুফল পায়নি এলাকার মানুষ। তবে লাভবান হয়েছে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অসাধু কিছু কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে রংছাতী ইউপি চেয়ারম্যান মোছাৎ তাহেরা খাতুন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, মহাদেও নদী সংরক্ষণ বাঁধ অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাই পাহাড়ি ঢল থেকে বরুয়াকোনা বাজার, বিজিবি বিওপি ক্যাম্প, চিকনটুপ গ্রামের সাড়ে তিনশ পরিবারকে রক্ষা করার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ করার জরুরি। এছাড়া তদন্তপূর্বক ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকতাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জানতে চাইলে নেত্রকোনা পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমার এসএও সঙ্গে কথা বলেন। তার নির্দেশ অনুযায়ি উপসহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কাছে জানতে চাইলে বলেন, আমি নেত্রকোনায় পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিসে নতুন যোগদান করেছি। এ বিষয়ে আমি এখন কিছুই বলতে বা তথ্য দিতে পারছি না। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত জানাতে পারব।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, মহাদেও নদী সংরক্ষণ বাঁধ নিম্নমান কাজের স্থানীয় লোকজনের মৌখিক অভিযোগ পেয়ে ইতোমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। শিডিউলে কী কী দিয়ে কাজ করার কথা, কোন দপ্তর করেছে আমার অফিসে এর কোনো কাগজ-পত্র নেই। তবে নিম্নমানের কাজ হওয়ায় চিকুনটুপ এলাকায় মহাদেও নদী সংরক্ষণ বাঁধ ধসে পড়েছে। সরেজমিনে দায়সারাভাবে মহাদেও নদী সংরক্ষণ বাঁধের কাজ করার সত্যতা পেয়েছি। ভাঙন এলাকায় জরুরিভিত্তিতে একটি স্থায়ী গাইডওয়াল নির্মাণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদার মো. ফজলুল হক প্রতিদিনের সংবাদকে মুঠোফোনে বলেন, মহাদেও একটা পাহাড়ি নদী। পাহাড়ি ঢলে নদীর পাড় ভেঙে গেছে। তবে কাজে অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের কাজের নির্দেশ অনুযায়ি কাজ করেছি, এর বাইরে আমার কিছু করার নেই।

 

"