চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্ধ ১৬ সিনেমা হল, ধুঁকছে আরো ২টি

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৯, ০০:০০

অলিউজ্জামান রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

সিনেমা হল সব মানুষের কাছে পরিচিত। ইংরেজি সিনেমা শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ চলচ্চিত্র। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে সিনেমা এখনো ‘বই’ হিসেবেই পরিচিত। একসময় জেলার সব মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা। স্বাধীনতার পর থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত সিনেমা হলের আঙ্গিনা দর্শকদের পদচারণায় মুখরিত থাকত। রাস্তার পাশে থাকত সিনেমার রঙিন সব পোস্টার। কখনো ভ্যানগাড়ি, কখনো ঘোড়ার গাড়িতে করে মাইকিং চলত ‘আসিতেছে আসিতেছে’, ‘চলিতেছে চলিতেছে’ ইত্যাদি সব বোল। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটনি শেষে সন্ধ্যায় সিনেমা হলে ভিড় জমাত সাধারণ পরিবারের দর্শকরা। মানুষের মুখে একটি কথা প্রচলিত ছিলÑ যে যত বেশি সিনেমা দেখেছে সে তত বেশি চালাক-চতুর হয়েছে। সে সময় স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানরা একসঙ্গে সিনেমা উপভোগ করতেন।

তথ্য মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৮টি সিনেমা হল থাকলেও বর্তমানে মাত্র দুটি টিকে রয়েছে। যেগুলো বর্তমানে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। হারিয়েছে জৌলুস। এখন আর শোনা যায় না সাধারণ মানুষের মুখে মুখে সিনেমার কাহিনি বা সিনেমার নাম।

১৯৭৩ সালে শিবগঞ্জ বাজারে শিবগঞ্জ সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পদ্মা নামে একটি সিনেমা হল, যা আজও টিকে আছে। তবে আগের মতো সিনেমার দর্শক নেই। এরপর ১৯৮৬ সালে শিবগঞ্জ বাজারে এদ্রিশ আহমেদ মোল্লা নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর উদ্যোগে লাকি সিনেমা হল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সিনেমা হল একসময় দর্শকের ভিড়ে মুখর থাকত। কিন্তু ২০০৭ সালের দিকে হলটি বন্ধ হয়ে যায়। শিবগঞ্জের বিনোদপুর বাজারে রফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন ঝুমুর হল। একই উপজেলার দাদনচকে স্মৃতি, কানসাট বাজারে শাপলা, রানীহাটি বাজারে স্মরণিকা সিনেমা হল ৯০ দশকের দিকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। শিবগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল আড়গাড়াহাটে স্থানীয় ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন আশা সিনেমা হল। হলটি ১৯৯৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

জেলার ভোলাহাট উপজেলায় স্বপ্না ও কিরণ নামে দুটি সিনেমা হল খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও এখন বন্ধ। হল ভেঙে বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে। গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরের ব্যবসায়ী মো. ফারুক আলম ১৯৮৬ সালে রংধনু নামে সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করেন। রহনপুর বাজারের আরেকটি জনপ্রিয় সিনেমা হল ছিল মুক্তাশা, যা প্রতিষ্ঠা করেন ব্যবসায়ী মুসা সরকার। গোমস্তাপুর বাজারে অভিলাষ নামের সিনেমা হলটি উপজেলার সব মানুষের কাছে অতি পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন গোমস্তাপুর উপজেলার সব সিনেমা হলই পুরোপুরি বন্ধ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে কোনোমতে টিকে আছে অত্যাধুনিক সিনেমা হল রাজমহল। এ হলটির মালিক স্থানীয় ব্যবসায়ী সাবের মীর। অথচ একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে আক্তার ইমাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গুলশান সিনেমা হল। পরে মো. রুহুল আমিন হলটি কিনে নেয়েছিলেন। এ সিনেমা হলে সুপারহিট সিনেমা চলত। এটি ভেঙে বর্তমানে ক্লাব সুপার মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। হলটির কোনো চিহ্নই নেই বর্তমানে। একইভাবে সন্ধ্যা সিনেমা হলে সিনেমা দেখা অনেকের কাছে গর্বের বিষয় ছিল। এ সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করেন স্থানীয় রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী মো. রুহুল আমিন। এখন হলটি কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শহরের উদয়ন মোড়ে অবস্থিত উদয়ন সিনেমা হলে প্রদর্শিত হতো বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি সিনেমা। দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে দর্শক আসত সিনেমা দেখতে। এখন উদয়ন সিনেমা হলটি কয়েক বছর ধরে পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। এ হলের মালিকও সাবের মীর।

নাচোল উপজেলায় ছিল আশা ও প্যারাডাইস নামে দুটি সিনেমা হল। এখন আশা সিনেমা হলে কয়েকটি রাইস মিল চালু করা হয়েছে। জেলার সিনেমা হলগুলোতে দুই ঈদে থাকত তরুণ-তরুণীদের উপচে পড়া ভিড়। চলত টিকিট কেনার মধুর প্রতিযোগিতা। টিকিট না পেয়ে অনেক সিনেমাপ্রেমী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে সিনেমা দেখতেন। সে সোনালি অতীত আর নেই। অধিকাংশ সিনেমা হলের স্মৃতিচিহ্ন বলতে কিছুই নেই। তবে সিনেমা হলের নামানুসারে নামকরণ হয়েছিল বিভিন্ন মোড় ও স্থানের নাম।

জানা গেছে, লোকসানের ভারেই বন্ধ হয়ে গেছে এসব সিনেমা হল। এছাড়াও মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির কারণে ঘরে বসেই দেশি-বিদেশি সিনেমা দেখা যাচ্ছে সহজেই। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ ইউটিউব ভিডিও চ্যানেলে সিনেমা দেখা। পাশাপাশি এক শ্রেণির মানুষ সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। দেশি চলচ্চিত্রের মানও খুব ভালো নয়। এতে সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শকরা। দেশি সিনেমা দ্বারা দর্শক টানা খুব চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেলার সিনেমা দর্শক ও সাংস্কৃতিককর্মী ফাইজুর রহমান মানি বলেন, এখনকার নির্মিত বাংলা সিনেমার কাহিনি দর্শক টানতে পারছে না। এছাড়া ঘরে বসেই পাচ্ছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সিনেমা দেখার সুযোগ।

মো. ইউসুফ আলী নামে আরেক সিনেমা দর্শক জানান, বর্তমান যুগে সবাই ব্যস্ত। অপর দিকে হাতের মুঠোয় ইউটিউব চ্যানেল চলে আসায় হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে মন চায় না। বর্তমানে মানসম্মত সিনেমাও তৈরি হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

 

 

"