সোনারগাঁয়ের ৪৫ গ্রামে জামদানি তৈরি

ঈদের সামনে কর্মমুখর জামদানি কারিগররা

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৯, ০০:০০

আশরাফুল আলম, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)

ঈদ সামনের রেখে কর্মমুখর হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার জামদানিপাড়া। উপজেলার ৪৫টি গ্রামে রাত-দিন ব্যস্ত সময় পারকরছেন জামদানি কারিগররা। এই গ্রামগুলোতে এখন ফরিয়া, মহাজন ও খুচরা ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।

সোনারগাঁ উপজেলার জামপুর, সাদিপুর ও কাঁচপুর ইউনিয়নের প্রায় ৪৫টি গ্রামের ছয় শতাধিক পরিবার জামদানি শাড়ী উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এ পেশায় নিয়োজিত কারিগরদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারী শ্রমিকই বেশি বলে জানান এর সঙ্গে জড়িত মালিক ও কারিগররা।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন উপজেলার আলমদী, চরভুলা, মালিপাড়া, সাদিপুর, ব্রাহ্মণবাওগাঁ, খেজুরতলা, কাজিপাড়া, চৌরাপাড়া, মুছারচর, শেকেরহাট, বাসাবো, তিলাব, বস্তল, কলতাপাড়া, কাহেনা, আটগড়িয়া, গনকবাড়ি, ওটমা, রাউদেরগাঁও, নয়াপুর, উত্তর কাজিপাড়া, চেঙ্গাইন, খালপাড় চেঙ্গাইন, ভারগাঁও, কান্ধাপাড়া, ফিরিপাড়া, বাইশটেকি, বাইশটেকী, বারগাঁও, কাজিপাড়া, শিংলাব, আন্দারমানিক, হাতুড়াপাড়া, তালতলা সুখেরটেক ও বেহাকৈর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে এসব গ্রামের জামদানির কারিগররা শাড়ী বুনন করে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা শাড়ী পাইকারদের হাতে তুলে দিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের কোন একজন কাপড়ের সুতা তুলছেন, অন্যজন সুতায় রঙ করছেন, কেউবা আবার শাড়ি বুনছেন অথবা শাড়িতে নকশার কাজ করছেন।

গনকবাড়ি গ্রামের জামদানি কারিগর সিমলা আক্তার ও জয়নাল আবেদীন জানান, সারা বছরের তুলনায় প্রতি বছরই রমজান মাসে ঈদুল ফিতরের পূর্বে সবচেয়ে বেশী ব্যস্ত সময় কাটান তারা। সৌখিন ক্রেতারা এসময়ের পূর্বেই তাদের পছন্দমতো নকশা করা শাড়ী অর্ডার করে থাকে। এসব অর্ডারের শাড়ী ঈদের পূর্বেই ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করতে হয়। বিশেষ করে ঈদে এ শাড়ীর চাহিদা বেশী থাকার কারনে অনেক কারিগর পুরো বছর ধরেই এ শাড়ী তৈরী করে মূল্য বেশী পাওয়ার আশায় ঘরে মজুদ রাখে।

শেকেরহাট গ্রামের কারিগর মোর্শেদা আক্তার ও আব্দুল মালেক জানান, বাপদাদার আমল থেকেই আমরা এ পেশায় জড়িত। বর্তমানে রেশমের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তাছাড়া কারিগরদের বেতন-ভাতা বাড়ানো যাচ্ছে না, বিধায় অনেকে নতুন করে এ পেশায় যুক্ত হতে চাচ্ছে না। জামদানির মূল্য সম্পর্কে কাঁজিপাড়া গ্রামের কারিগর বানেসা বিবি জানান, প্রতিটি শাড়ি তারা ২ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। একটি শাড়ী তৈরিতে নকশার প্রকারভেদে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়।

জামদানি শাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁত মালিকরা জানান, আগে জামদানি শিল্পীরা শুধু শাড়ি তৈরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে বর্তমানে জামদানি শিল্পে এসেছে নতুনত্ব। শাড়ি তৈরির পাশাপাশি থ্রি পিস, ওড়না, পাঞ্জাবি, ঘর দরজার পর্দার কাপড়ও তৈরি হচ্ছে এখানে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানি শাড়ির চাহিদা বেড়ে গেছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এবার আরও উন্নত এবং নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করছেন কারিগররা। সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জ এ দুটি উপজেলায় বর্তমানে এ শাড়ি তৈয়ারী সবচেয়ে বেশী হচ্ছে। প্রতি শুক্রবার রাজধানী ঢাকার ডেমরা এলাকায় এ শাড়ির হাট বসে। এখান থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা পাইকারী দামে শাড়ি ক্রয় করে থাকেন।

সোনারগাঁ জামদানি তাঁত শিল্পের প্রাথমিক সমিতির সভাপতি মজিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে জামদানি শিল্পীদের নীরব দুর্দিন যাচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভ খাচ্ছে। সহজ-সরল নারী শ্রমিক, অসচ্ছল ও নিরীহ জামদানি তাঁতিরা এক শ্রেণির ফরিয়া ও দাদন ব্যবসায়ী মহাজনদের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জামদানি শিল্প দেশের রফতানি খাতে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

এই সমিতি নেতা বলেন, মসলিনের পর আমাদের দেশের বুনন শিল্পের গৌরব ধরে রেখেছে জামদানি। জামদানিকে অনেকে মসলিনের উত্তরাধিকার হিসেবে চেনে। কার্পাস তুলা দিয়ে এ শাড়ি কারিগরেরা তৈরি করে থাকেন। যা বুননের সময়েই কাপড়ে সুন্দরভাবে গেথে যায়। অল্প পুঁজিতেই যেকোন কারিগর কয়েকটি বাঁশ খন্ডের সমন্বয়ে তাঁত তৈরি করে, সাধারন সুতা, সিল্ক ও জড়ি ইত্যাদি উপকরন দিয়েই জামদানি তৈরি করতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার সরকার জানান, সোনারগাঁয়ের তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৪৫টি গ্রামে দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শাড়ি তৈরি করে যাচ্ছে কারিগররা। আমরা এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের সহজশর্তে ঋণ দেওয়াসহ সরকারিভাবে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করি সব সময়।

 

"