ন্যায্য অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন চান শ্রমিকরা

চা শ্রমিক দিবস আজ

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৯, ০০:০০

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চা শিল্প। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ শিল্প যাদের শ্রমে-ঘামে টিকে থাকছে, সেই শ্রমিকরাই কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন। ২৬ ইঞ্চির চা গাছের মতো ছেঁটে লেবার লাইনের ২২২ বর্গফুটের কুঁড়ে ঘরে বন্দি তারা। দাসের মতো বাগানের সঙ্গে বাধা নিয়তি। এ থেকে মুক্তি পেতে ৯৭ বছর আগে ‘মুল্লক চলো’ আওয়াজ তুলে গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথে ব্রিটিশ সরকারের গোর্খ্যা সৈনিকের হাতে নিহত হন হাজারো শ্রমিক। সেই থেকে ২০ মে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করছেন তারা। দৈনিক মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবিতে চা শ্রমিকদের ন্যায় সংগত সংগ্রাম এখনও চালু রয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সিলেট অঞ্চলে প্রথম চা উৎপাদন শুরু করে ব্রিটিশ মালিকেরা। উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে উপমহাদেশের দরিদ্র্যপীড়িত আসাম, উড়িসাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিব মানুষদের এনে চা-বাগানের কাজে লাগিয়ে ছিলেন তারা। কিন্তু নামমাত্র মজুরিতে অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হতো তাদের। দিনের পর দিন অবর্ণনীয় শোষণ-নির্যাতন ও মানবেতর জীবনযাপনে অতিষ্ঠ হয়ে একসময় শ্রমিকেরা কাজ ছেড়ে নিজেদের এলাকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯২১ সালের ২০ মে ‘মুল্লক চলো’ আওয়াজ তুলে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক চাঁদপুরে পৌঁছেছিলেন স্টিমারে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য। সেখানে বাধা দেয় মালিকপক্ষ। পরে ব্রিটিশ সরকারের গোর্খা সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করে হাজারো মেহনতি। তাঁদের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় মেঘনা নদীতে।

শ্রীমঙ্গলসহ দেশের প্রায় ১৬৫টি চা বাগানের শ্রমিকরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। প্রায় ২০০ বছর ধরে মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে বংশ পর¤পরায় কাজ করছেন চা শ্রমিকরা। তাদের শ্রমে এই শিল্পের উন্নয়ন হলেও শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না। দৈনিক একজন শ্রমিকের মজুরি মাত্র ১০২ টাকা। আর সেই সঙ্গে সপ্তাহ শেষে তিন কেজি খাওয়ার অনুপযোগী আটা। তাও আবার ওজনে কম।

সরেজমিনের জানা যায়, মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি তাদের। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে চা বাগান আগলে রাখলেও তাদের শিক্ষা ও চিকিৎসা এখন সেই অবহেলিত রয়ে গেছে। সরকার তাদের আবাস্থল নিজ নিজ মালিকানায় করে দিবে বলেও এখনো এর কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। আর এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভূমি নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন চা জনগোষ্ঠী।

চা শ্রমিকরা জানান, বাগানের হাসপাতালে ভালো চিকিৎসার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বাগানে যে কয়েকটা ছোট হাসপাতাল (ডিসপেন্সারি) রয়েছে তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ ও ডাক্তার নেই। অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। তাছাড়া বাগানের কিছু কিছু ছেলে-মেয়েরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও চাকরির ক্ষেত্রে বড় কোনো পদ পাচ্ছেনা।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা পরাগ বাঁড়ই বলেন, চা শ্রমিকরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এ দেশে বাস করছে। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযোদ্ধে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিল। সেই চা শ্রমিকরা আজও অবহেলিত। সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, এই অবহেলিত চা শ্রমিকদের বাসস্থানের জায়গাটুকু যাতে তাদের নিজের নামে করে দেয়া হয়। যাতে বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের যখন তখন ভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে না পারে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক রাম ভজন কৈরী জানান, চা শ্রমিকদের ২০ দফা দাবি মালিকপক্ষকে লিখিত দেয়ার পর কয়েক দফা দ্বি-পক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। তবে মালিকপক্ষ কালক্ষেপণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাংলাদেশের চা পৃথিবীর ২৫টি দেশে রফতানি করা হয়। আর এই চা উৎপাদনের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত চা-শ্রমিকরা। কিন্তু চা-শ্রমিকরা সকল নাগরিক সুবিধা ভোগের অধিকার সমভাবে প্রাপ্য হলেও তারা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বৈষম্যের শিকার। যাদের শ্রমে অর্জিত হচ্ছে হাজার কোটি বৈদশিক মুদ্রা, তাদের অবহেলিত না রেখে একটু ভালো ভাবে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার ন্যায্য অধিকারই এখন চা শ্রমিকদের প্রত্যাশা।

 

"