অপরিকল্পিত খননে ধসে গেছে চত্রা পাড়ের সড়ক

প্রকাশ : ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০

খন্দকার রবিউল ইসলাম, রাজবাড়ী

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় বহমান নদী চত্রা পুনঃখনন কাজ শেষ না হতেই পাকা সড়ক ধ্বসে নদী গর্ভে চলে যাচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটা ও অবৈধভাবে বিক্রির ফলে এ ধ্বস তৈরি হয়েছে। এদিকে নদী খননের মাটি বিক্রির করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ জন্য সড়কের উপর মাটি জমিয়ে রাখায় উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ দুটি সড়ক চলাচলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও যানবাহন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজসে এই অপরিকল্পিত কাজ হয়েছে। স্থানীয়রা এর প্রতিবাদ করলেও স্থানীয় পাউবোর এসও মাহমুদুল হাসান তা চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। এমনকি এজন্য প্রতিবাদীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন তিনি।

এলাকাবাসীর দাবী, খননের আগেই চত্রা অনেক গভীর ছিল। নতুন করে খননের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। সম্প্রতি কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে তীর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু কিছুব্যক্তি স্বার্থে দুই দফা সরকারি টাকা পানিতে চলে যাচ্ছে, এবার তৃতীয় দফায় ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আশায়।

সরেজমিনে গতকাল উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের খাটিয়াগাড়া, চরঘিকমলা, বাকসাডাঙ্গী, বিলটাকাপোড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নারুয়া বাজার থেকে লাঙ্গলবাঁধ ঘাট পর্যন্ত সড়কের বাকসাডাঙ্গী এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার জায়গা নিয়ে পাকা সড়ক ধ্বসে নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে বন্ধ হয়েছে গেছে যানবাহন চলাচল।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় পাউবোর তত্তাবধানে ৬৪ জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুণঃখনন প্রকল্পের প্রথম পর্যায় শুরু হয়েছে। রাজবাড়ী পাউবোর বিভাগের অধীনে জেলার চত্রা নদীর ১৬ থেকে ২৩ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বালিয়াকান্দি উপজেলার অংশের প্রায় ৭ কিলোমিটার নদী পুনঃখনন শুরু হয়ে। ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নূনা ট্রেডার্স ৭ কোটে ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এর দায়িত্ব নিয়েছে।

স্থানীয় মো. স্বপন সিকদার, সোহেল রানাসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, চত্রা নদী যে গভীর ছিল, সেখানে নতুন করে খননের প্রয়োজন হয়েছে শুধু লুটপাটের জন্য। নারুয়া বাজার থেকে লাঙ্গলবাঁধ সড়কটির উপর মাটি ফেলে সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়। সড়কের পাশ কেটে গর্ত করা হয়। এলাকার লোকজন বাধা দিলেও জোড়পুর্বক রাস্তার সোল্ডার (পাশ) খুড়ে খনন করায় এ ভাঙ্গনের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন ইট ভাটা ও স্থানীয় লোকজনের কাছে মাটি বিক্রি করার জন্যই সড়কের উপর মাটি স্তুপ করে রাখা হয়। প্রতিবাদের মুখে পরে তা সরিয়ে ফেললেও সড়কের উপর থাকায় অংশ সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা-পানিতে একাকার হয়ে পড়ে। ফলে সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।

নদী খননের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি লুলু বিশ্বাস জানিয়েছেন, যেভাবে মাটি কাটার নিয়ম আছে সে অনুযায়ী কাটা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কয়েকদিন চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, সব জায়গায় তো ধ্বস হয়নি। এক জায়গায় হতেই পারে। আমরা তো পানি উন্নয়ন বোর্ডের নকশা অনুযায়ী কাজ করছি। যাতে আর ভাঙ্গনের সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলার নারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সালাম বলেন, সড়কের পাশ খুড়ে খনন করতে আগে থেকেই নিষেধ করেছি। তবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি তা না করায় পাকা সড়ক ভেঙ্গে নদীতে চলে গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহন করা প্রয়োজন।

জানতে চাইলে বালিয়াকান্দি উপজেলা পাউবো’র এস.ও. মাহমুদুল হাসান এলাকাবাসীর সঙ্গে অসৎআচরণের বিষয়ে বলেন, কারো সঙ্গে আমার কোন সমস্যা হয়নি। সড়কে ফাটল ধরেছে বিষয়টি উর্দ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ছিলাম। তবে তিনি স্বীকার করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খননের মাটি বিক্রি করতে পারে না।

এদিকে সড়ক ধ্বসের পর গতকাল আক্রান্ত এলাকা পরির্দশন করেছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এসএম নূরুন নবী। নদী খননের মাটি ঠিকাদার বিক্রি করেছেন কিনা, বিষয়টি তার জানা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদি ঠিকাদার মাটি বিক্রি করে থাকে সেটি অন্যায় করেছেন।’ রাস্তা ধ্বসের প্রসঙ্গে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘নদী থেকে উত্তলনকৃত মাটি স্তব করে রাস্তার উপড়ে রাখার কারণেই মূলত রাস্তাটি ভেঙ্গে গেছে। সড়কটি মেরামত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’ সড়ক মেরামত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ঠিকাদারের ভুলেই রাস্তাটি ভেঙ্গে গেছে, সে কারণে রাস্তাটি সম্পূর্ণভাবে ঠিক করার দায়িত্ব ঠিকাদারকেই নিতে হবে। ঠিাকাদার যাতে নিজ খরচে রাস্তাটি ভালো ভাবে পিস ঢালাই করে মেরামত করে দেন, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’ এদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি করা প্রসঙ্গ বলেন প্রকৌশলী বলেন, ‘মাটি বিক্রির সরকারি যে রেট আছে সে রেটের রয়েলইটির টাকা কোষাগারে জমা দিয়ে মাটি বিক্রি করবে।’

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাসুম রেজা বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে নদী খননের কাজটি করা হচ্ছে। আমাদের মিটিং এ সড়কে ফাটল ধরার বিষয়টি আলাপ হয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। আগামী জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।

 

"