মৃতপ্রায় চাঁপাইয়ের চার নদী জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব

ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ দিবস

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০

অলিউজ্জামান রুবেল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাসহ চার নদীই এখন মৃতপ্রায়। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এই অবস্থায় পড়েছে নদীগুলো। সেই সঙ্গে প্রভাব পড়েছে ইলিশ ও চিংড়িসহ স্বাদুপানির মাছের বংশ বিস্তারে। এদিকে সারাবছর পানির না থাকলেও, বর্ষায় বাঁধের কপাট খুলে দিলে ভাঙনের মুখে পড়ে ভাটি অঞ্চলে। এই বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ও পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ করা হয়। সেই থেকে এই দিনকে ফারাক্কা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত ফারাক্কা ব্যারেজের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। ওই বছর থেকেই ব্যারাজের মাধ্যমে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত।

স্থানীয়রা বলছেন, নদীতে এখন পানির প্রবাহ নির্ভর করে ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। শুষ্ক মৌসুমে পানি পাওয়া যায় না, আবার বর্ষায় হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে বন্যা এবং নদী ভাঙন দেখা দেয়। এদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় জীববৈচিত্রের ওপর মারাত্মক বিরুপ প্রভাব পড়েছে।

মৎসজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাঁধের ফলে ইলিশ মাছ এবং চিংড়ি মাছের বিরাট ক্ষতি হয়েছে, তাদের প্রজননে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য মাছের সংখ্যা কমে গেছে। আর উপকূল এলাকায় মানুষ একটা মিষ্টি পানির ওপর নির্ভরশীল যাদের জীবন, সেটা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পদ্মার চরের বাসিন্দারা জানান, ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের আগে, পদ্মায় ছিল থৈ থৈ পানি। আর ব্যারেজ নির্মাণের পর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। এখন ভারতের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে পদ্মার পানি প্রবাহের মাত্রা। শুষ্ক মৌসুমে কখনো কখনো নৌকাও চালানো যায় না এই নদীতে। তাদের অভিযোগ, পদ্মার চর এলাকায় ইরি ধান, ভুট্টা, কলা, পটলসহ বিভিন্ন ফসল রয়েছে। কিন্তু যথাসময়ে পানি দিতে না পারায় কাক্সিক্ষত ফসল উৎপাদন নিয়ে সংসয় রয়েছে তাদের।

স্থানীয় পরিবেশবাদীদের উদ্বৃতি দিয়ে ‘সেভ দ্য নেচার’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান সমন্বয়কারী রবিউল হাসান ডলার জানান, পদ্মায় পানি না থাকায় পরিবেশের উপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উদ্ভিদ ও জীবচক্র। বিশেষ করে শুশুক ও ঘড়িয়ালের প্রজননস্থল পদ্মা নদী হওয়ায় এই প্রাণী দুটি হুমকির মুখে পড়েছে।

ফারাক্কা ব্যারেজের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাসহ অন্য তিন নদী মহানন্দা, পাগলা ও পুনর্ভবা শুকিয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী (পাউবো) প্রকৌশলী সাহেদুল আলম। তিনি জানান, ব্যারেজ নির্মাণের পর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নদীতে নাব্য সংকট দেখা দেয়। এখন প্রয়োজনীয় পানি পেলেও তা ধরে রাখা যায় না। আর ফারাক্কা ব্যারেজের দরজা হঠাৎ খুলে দেয়ার কারণে বন্যা ও নদী ভাঙন প্রবণতা বাড়ছে।

বাংলাদেশের নদীগবেষণা ইনস্টিটিউট ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক এক সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার আগে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ছিল ৬০ থেকে ৮০ হাজার হাজার কিউসেক। ফারাক্কা ওদের যে ডাইভারশন ক্যানেল, ব্যারেজের মাধ্যমে তারা ৪০ হাজার কিউসেক পানি সরিয়ে নিতে পারে। তো সেটি সরিয়ে নেওয়ার পরে যেটি থাকে সেটি পায় বাংলাদেশ। গঙ্গা চুক্তিতে অন্তত ২৭ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির আগে অনেক সময় ১০ হাজার কিউসেকেরও কম পানি এসেছে বলে জানান তিনি।

১৯৭৬ সালের মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ফারাক্কার অভিমুখে লংমার্চে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক কানসাট রাজবাড়ী মাঠে গিয়ে শেষ হয়। স্থানীয়রা বলছেন, মওলানা ভাসানী নায্য পানির দাবিতে লংমার্চ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এসেছিলেন। এখন তা দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।

 

 

"