নামসর্বস্ব বেকারি পণ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভোক্তারা

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০

নোয়াখালী ও কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি

নোয়াখালীর যত্রতত্র গড়ে উঠেছে নামসর্বস্ব কয়েকশ বেকারি। এসব কারখানায় অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বিভিন্ন খাবারসামগ্রী তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে। একই অবস্থা গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোটবড় ১৬টি কারখানা বেকারি সামগ্রী তৈরির করছে। এসব কারখানার উৎপাদিত সামগ্রীর মধ্যে আছে কেক বিস্কুট, চানাচুর, পাউরুটি, বাটারবন, মিষ্টি, সন্দেশ, ক্রিমরোল, প্যাটিস, ড্যানিস, সল্টটেস্ট, ড্রাই কেক, টোস্ট সহ নানা প্রকার লোভনীয় ও মুখরোচক সব খাবার। এ সামগ্রী বাজার, পাড়ামহল্লায় ছোটবড় দোকান থেকে শুরু করে ফাস্টফুডের দোকান, কনফেকশনারি, স্টেশনারি, জেনারেল স্টোর, মুদি দোকান ও চায়ের দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। এগুলো খেয়ে নানা স্থানীয়দের মধ্যে রোগ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি, বড় ধরনে স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নোয়াখালী প্রতিনিধি জুয়েল রানা লিটন ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা প্রতিনিধি খোরশেদ আলমের পাঠান খবর :

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলার অনেকগুলো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের নাম নকল করে বাজারজাত করছে নিম্নমানের এসব সামগ্রী। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানদাররা প্রতিনিয়ত এসব সামগ্রী কিনলেও মালিক বা কারখানার অস্তিত্ব জানেন না অনেকেই।

সদরের সোনাপুরের হারিছ মিয়া জানান, প্রতিদিন সকাল-বিকাল ভ্যানে করে বেকারিপণ্য দোকানে পৌঁছে দেয় বিভিন্ন বেকারির ভ্যানচালকরা। খাদ্যসামগ্রীর লেবেলে কারখানার নাম থাকলেও ঠিকানা থাকে না। উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখের বালাই নেই। সম্প্রতি সরেজমিনেও মিলেছে এসব তথ্য।

সোনাপুর-কবিরহাট সড়কের পাশে একটি ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে দেখা গেছে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী। দেখা যায়, দুর্গন্ধযুক্ত কারখানাতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘর্মাক্তবস্থায় শ্রমিকরা গ্লাভস ছাড়াই সিগারেট হাতে পাউরুটি, টোস্ট বিস্কুট ও অন্যান্য খাদসামগ্রী তৈরি করছেন। এ সময় মেঝে ও তৈরিকৃত পণ্যের গায়ে এবং পাত্রে ভনভন করছে মাছি। চৌকির নিচে অন্ধকার ও অপরিষ্কার স্থানে বিস্কুটগুলো রাখা হয়েছে। সেখানেও মাছির উপদ্রব। পরিশোধিত ফয়েল পলিপ্যাক ছাড়াই নিম্নমানের অপরিশোধিত পলিপ্যাকে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে খাদ্যসামগ্রী প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। প্যাকেটগুলোতে বেকারির নাম, উৎপাদন, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ লেখা নেই। নেই বিএসটিআইয়ের অনুমোদন। আছে শুধু একটি পৌর ট্রেড লাইসেন্স। জানতে চাইলে কারখানা মালিক জানান, দেশের অন্যরা যেভাবে করছে তিনিও সেভাবে চালাচ্ছেন। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন প্রসঙ্গে তিনি জানান, জেলায় কোনো বেকারির অনুমোদন নেই।

ডায়বেটিস চিকিৎসক আবদুস সাত্তার ফরায়েজী জানান, অনেকগুলো রোগের উৎপত্তির অন্যতম কারণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের তৈরিকৃত খাবার। এসব বিস্কুট, টোস্ট ও পাউরুটিতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যকর মান রাখা হয় না বলে অনেকে এগুলো খেয়ে ডায়বেটিসের শিকার হচ্ছেন স্বল্প সময়ে। জেলা ভোক্তা অধিকারের সভাপতি আবদুল মান্নান জানান, তারা ভুয়া বেকারির একটি তালিকা করছেন। এর পুরো কাজ শেষ হলে তারা এটি জেলা প্রশাসনসহ বিএসটিআইয়ে কাছে জমা দেবেন।

জেলা বিএসটিআইর উপপরিচালক দেলওয়ার হোসেন জানান, ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট কারখানা করতে পরিবশে অধিদফতরসহ অনেকগুলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দরকার হয়। কিন্তু অনেক ক্ষদ্র ব্যবসায়ী একটি আবেদন ফরম জমা দিয়েই কাজ শুরু করেন। এদিকে জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস জানান, অনুমোদনহীন বেকারির সঠিক তথ্য পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলা প্রতিনিধি জানান, উপজেলার চন্দ্রা ত্রি-মোড়ের ডাইনকিনি রোডে তিতাস বেকারি এন্ড ফাস্টফুড, সফিপুর বাজার, আন্দার মানিক, হরিন হাটি, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ, ফুলবাড়ীয়া, দাড়িয়াপুর, মৌচাক, রাখালিয়া চালা, কালিয়াকৈর বাজার, সাহেব বাজার, বাড়ই পাড়া হ্যাসং বিডি গেট, বলিয়াদি বাজারসহ ছোটবড় ১৫-১৬টি বেকারী সামগ্রী তৈরির কারখানা রয়েছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, ভেতরে স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে খাবার সামগ্রী। প্রতিদিন কারখানার তৈরি এই পণ্য ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানীর নিজস্ব ভ্যানে করে বিভিন্ন এলাকার পাড়া মহল্লায় বেকারী পণ্য পৌঁছে দেন ডেলিভারিম্যানরা। এ সব খাদ্য সামগ্রীর মোড়কে বিএসটিআই, বিডিএস-৫০৬, বিডিআই-৪৮৩ এমন ভাবে বিভিন্ন নম্বর লেখা রয়েছে। মোড়কের গায়ে এ সব লেবেলে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ন কথাগুলি লেখা থাকলেও কত তারিখে উৎপাদন হয়েছে আর কত তারিখে মেয়াদ শেষ হবে তার কোন উল্লেখ নেই।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুল আমিন জানান, খাদ্য নীতিমালা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

 

"