তেঁতুলিয়ায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন

অনাবাদি হয়ে পড়ছে ফসলি জমি

পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০

এস কে দোয়েল, তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়)

কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না ড্রেজার মেশিনে পাথর উত্তোলন! এতে করে মরুভূমিতে রূপ নিচ্ছে একরের পর একর ফসলি জমি। সেই সঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কায় অনাবাদি হয়ে পড়ছে অনেক জমি। সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ায় অবৈধ বোমা মেশিনে চলছে এই পাথর উত্তোলন। অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রভাবশালী মহল ও কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে বিশেষ ব্যবস্থায় ম্যানেজ করে বোমা মেশিনের সাহায্যে পাথর তোলা হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বোমা মেশিনে পাথর উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। অস্তিত্ব হারিয়েছে বেশ কয়েকটি নদী। ডাহুক, ভেরসা, করতোয়া নদীগুলো হারিয়েছে গতিমুখ। মাটির নিচে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর শূন্যতা। রাতের আঁধারে মাত্রাতিরিক্ত হারে ড্রেজার মেশিনের বিকট শব্দে রাতের ঘুম হারাম করেছে নিকটবর্তী এলাকার মানুষের। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, সাধারণ ভূমিকম্পে যেকোনো সময় বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে যেতে পারে এ এলাকার আবাদি জমি, বসত বাড়িসহ অনেক প্রতিষ্ঠান।

সরেজমিনে দেখা যায়, দেবনগড় ইউপির শিবচন্ডি, জয়গোনজোত, কালিয়ামনি গ্রামের করতোয়া নদী সংলগ্ন ও পার্শ্ববর্তী এলাকা, ঝালেঙ্গিগছ, ধানশুকা গ্রামের করতোয়া নদী সংলগ্ন এলাকা, পাথরঘাটা, আঠারখারী, সুরিগছ, শেখগছ, ময়নাগুড়ি গ্রামের বিভিন্ন সমতলভূমির পাথরের গর্তে, ভজনপুর ইউনিয়নের বোগলাহাগী, চোয়ামতি, ফকিরহাট, ভাংঙ্গিপাড়া, বাশবাড়ী, ভদ্রেশর, কুকুরমুহা, গনাগছ গ্রামের করতোয়া নদী সংলগ্ন খাস জমি ও পার্শ্ববর্তী সমতল এলাকায়, একই ইউনিয়নের খুনিয়াগছ, গিতালগছ, ডাক্তারপাড়া, ডিমাগছ, বৈরাগিগছ, ঘগারখাল, কাউরগছ, ডাংঙ্গি গ্রামের বিভিন্ন সমতলভূমির পাথরের গর্তে, বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের হারাদিঘি, বালাবাড়ী, শিলাইগুড়ি, কালদাস পাড়া বালাবাড়ী, কাটাপাড়ার ডাহুক নদী সংলগ্ন এলাকায়, শালবাহান ইউপির অন্তর্গত মহাসড়ক সংলগ্ন মাঝিপাড়া গুচ্ছগ্রাম হতে ৪ কিলোমিটার উত্তরে কালীতলা গ্রাম পর্যন্ত ডাহুক নদীর বিস্তৃীর্ণ এলাকা। রাতের আধারে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করায় এলাকাগুলো মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

এই ড্রেজার মেশিনের সাথে জড়িত অনেকেই শ্রমিক থেকে কোটিপতি হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ভজনপুরের আবু বক্কর, গণাগছ এলাকার এসারুল ইসলাম ও শালবাহান পেদিয়াগছ এলাকার কালাচান মিয়ার ছেলে শেখ ফরিদ। এরা এক সময় ছিলেন পাথর শ্রমিক, এখন কোটিপতি। অন্য সুবিধাভোগীরাও হয়েছে লাখপতি। বক্কর নিজেই ছিল পাথর শ্রমিক। এখন সে কোটিপতি। তার রয়েছে আলিশান বাড়ি। ট্রাক্টর ও নিজস্ব ওয়ার্কশপসহ রয়েছে নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি। এসারুলও ছিল দিন মজুর। এখন প্রায় ১০ কোটি টাকার সম্পদ হয়েছে তার। শালবাহান শেখ ফরিদ ছিলেন পাথর শ্রমিক। এখন সে কোটিপতি। সম্প্রতি তাকে তেঁতুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে জমি ক্রয় করতে দেখা গেছে। অথচ এই শেখ ফরিদের নামেই রয়েছে ১৪টি মামলা। মামলাগুলো বিচারাধীন থাকলেও শেখ ফরিদসহ কোন আসামিরই এখন পর্যন্ত কোন শাস্তি হয়নি।

ড্রেজার মেশিন বন্ধে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিবাদ। মানবন্ধনের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি। মঞ্চস্থ হয়েছে সচেতনতামূলক প্রতিবাদী নাটক। ‘জাগ্রত তেঁতুলিয়া’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গত বছর ড্রেজার মেশিন বিরোধী প্রতিবাদের ডাক দিলে নড়েচড়ে উঠে পুলিশ প্রশাসন। সম্প্রতি ‘ড্রেজার হটাও, পঞ্চগড় বাঁচাও-ড্রেজার মুক্ত পঞ্চগড় চাই’ দাবিতে মানববন্ধন হয়। তারপরেও বন্ধ হচ্ছে না এ পাথর উত্তোলন। এর কারণ সম্পর্কে পঞ্চগড় নাগরিক কমিটির সম্পাদক অ্যাড. এরশাদ হোসেন সরকার জানান, ড্রেজার মেশিনের মামলাগুলো তেমন শক্তিশালী নয় বলে আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। তবে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন গত এক বছরে টাস্কফোর্সের অভিযানে ১৬৯টি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস ও জব্দ করেছে।

পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তোহিদুল বারী জানান, ‘ড্রেজার ও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলায় গভীরে বিশালাকার শুন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে মাঝারী মাত্রার ভূমিকম্প হলেই ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।’

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানিউল ফেরদৌস জানান, আমি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত করে জেলা জরিমানা করেছি অনেক। নিয়মিত মামলাও দিয়েছি। জামিনে বেড়িয়ে এসে আবারও তারা শুরু করেন পাথর তোলা। অনেক মেশিন জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও বন্ধ হচ্ছে না।

ওসি জহুরুল ইসলাম বলেন, বোমা মেশিন নিয়ে আমরা অত্যন্ত তৎপর রয়েছি। অনেক বোমা মেশিন জব্দ করেছি। তবে প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় পুলিশের একার পক্ষে বোমা মেশিন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছেনা।

"