মাতামুহুরীতে বালু উত্তোলন হুমকিতে সেতু ও সড়ক

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নাজমুল সাঈদ সোহেল, চকরিয়া (কক্সবাজার)

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার নদী মাতামুহুরীতে ড্রেজিংয়ের নামে চলছে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন এই কাজ কারছে। চিরিঙ্গা সেতুর নিচ থেকে উত্তোলিত বালু নির্দিষ্ট পয়েন্টে মজুদ না রেখে বাহিরে বিক্রি করে দিচ্ছেন তারা।

এর আগে উপজেলার ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) খোন্দকার মো. ইখতিয়ার উদ্দিন আরাফাতের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে ৫টি বড় বড় লরি (ট্রাক) জব্দ ও লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবৈধ বালু বাণিজ্যের কারণে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অধীন উপজেলার অন্তত ১৫টি সরকারি বালু মহালে কয়েক মাস ধরে বালু বিক্রি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ইজারাদাররা। এতে করে বালুমহাল ইজারা খাতে জেলা প্রশাসন ৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন। সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হলেও স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তৎপরতার অভাবের অভিযোগ আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অধীনে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ১৫টি বালু মহাল রয়েছে। তারমধ্যে উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নে চারটি, ডুলাহাজারা ইউনিয়নে তিনটি, পাগলিরবিলে একটি, ফুলছড়িতে একটি, ফাসিয়াখালীতে দুইটি ও কোনাখালীতে একটি। প্রতি বছর জেলা প্রশাসন এই ১৫টি বালু মহাল ইজারা দিয়ে কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করেন। অনুরূপভাবে গতমাসে এসব বালু মহাল প্রায় ৩ কোটি টাকায় নতুনভাবে ইজারা দিয়েছেন জেলা প্রশাসন।

মাতামুহুরী নদীর নাব্য ফেরাতে একটি প্রকল্প গ্রহন করে পাউবো। প্রকল্পের অধীনে বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা মাতামুহুরী সেতুর পয়েন্ট থেকে উপরে-নীচের অংশ মিলিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সরেজমিনের দেখা যায়, উত্তোলনকৃত বালু প্রতিদিন একাধিক ট্রাক-ডাম্পার, লরি দিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এসব বালু অন্যত্র সরানো ও বিক্রির কোনো প্রশাসনিক অনুমতি নেই। তারপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন এ কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি নির্মিত নতুন সেতুর অন্তত ১ হাজার থেকে দেড় হাজার ফুটের মধ্যে বালু উত্তোলনের নিয়ম না থাকলেও তাও মানছে না উত্তোলনকারীরা।

স্থানীয় লোকজন জানান, সরকারি টাকা খরচ করে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও বেশির ভাগ বালু ফের পানির সঙ্গে নদীতে নেমে যাচ্ছে। অপরদিকে তীর এলাকায় শক্তিশালী মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর একাধিক পয়েন্টে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। আশপাশের ফসলি জমিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসির অভিযোগ করে জানান, উত্তোলনকৃত বালু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রতিদিন ৫০-৬০টি ডাম্পার ট্রাকে করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ও রেল লাইন প্রকল্পে বালু বিক্রি করে আসছে। নদী চরে এসব বালু উত্তোলনে ব্যবহার করা হচ্ছে স্কেভেটার মেশিন। ফলে বালু ভর্তি ভারি ট্রাক চলাচলের কারণে বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং বেতুয়াবাজার-বাঘগুজারা সড়ক ভেঙে একাধিক খানা-খন্দেক ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনগনের স্বাভাবিক চলাচল বিঘিœত হচ্ছে।

চকরিয়া উপজেলার একাধিক বালু মহালের ইজারদার অভিযোগ করেছেন, সরকারি টাকায় মাতামুহুরী নদীর ড্রেজিং করার বিষয়টি একটি ভাল উদ্যোগ। উত্তোলনকৃত বালু বাহিরে বিক্রি করার জন্য কার্যাদেশে কোন ধরনের নির্দেশনা না থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তা অমান্য করে চলছেন। উল্টো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে প্রতিদিন ৫০-৬০টি ট্রাকে করে উত্তোলনকৃত বালু বাইরে বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ অবস্থার কারনে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিনা বাঁধায় অবাদে বিক্রি করা হচ্ছে মাতামুহুরী নদী থেকে উত্তোলনকৃত বালু।

ভুক্তভোগী বালু মহাল ইজারদাররা নাছির উদ্দিন, জামশেদ উদ্দিন বাবুল, মুজিবুল হক, জিল্লুর রহমান, মমতাজ আহমদ, লিটনসহ একাধিক ইজারাদার দাবি করেছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বালু বাণিজ্যের কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে এবছরও জেলা প্রশাসন কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বৈধ বালু মহাল ইজারাদাররা অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বালু বাণিজ্য বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুদ্দিন মুহাম্মদ শিবলী নোমান বলেন, মাতামুহুরী নদীর চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করে অর্থদ- দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক বিভিন্ন বাধ্যবাদকতার কারণে অভিযান চালানো সম্ভব হয়ে উঠছে না। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়ার পর শীঘ্রই ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জোরদার করা হবে।

"