যশোরে নজর কেড়েছে নববর্ষের আমন্ত্রণপত্র

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

এইচ আর তুহিন, যশোর

শিল্পী মনের সৃষ্টিশীলতার অনুমপ নিদর্শন যশোরের বৈশাখী আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ নববর্ষের আমন্ত্রণপত্র। প্রতিবছরই যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তাদের শৈল্পিক মনের দৃষ্টিনন্দন ব্যতিক্রমী নিমন্ত্রণপত্রে আমন্ত্রণ জানায় অতিথিদের। জেলার এ ঐতিহ্য ধরে এবারো তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

বৈচিত্রময় আমন্ত্রণপত্র তৈরির নিরব প্রতিযোগিতার মানসে রঙ তুলির আঁচড়ে হরেক রকম আমন্ত্রণপত্র তৈরিতে তাই বিন্দুমাত্র কার্পণ্য নেই যশোরের প্রায় সবগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের। হারিয়ে যাওয়া বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে এ যেন এক আবেগময় প্রতিযোগিতা। তাইতো মাটির টানে ফিরে যেতে দেশীয় নানা উপকরণের সংমিশ্রণে আবহমান গ্রাম বাংলার চিরাতয় দৃশ্যের শৈল্পিক উপস্থাপনার আমন্ত্রণপত্র যশোরসহ দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ইতোমধ্যে এ নান্দনিক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে গেছে অতিথিদের মাঝে।

এক সময় হাতে লেখা চিঠিপত্রের মাধ্যমেই সকল যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। যুগের পরিবর্তনে সেই স্থান দখল করে নিয়েছে আধুনিক নানা মাধ্যম। ডাক বিভাগের সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পোস্টকার্ড দিয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছে অতিথিদের। কাঠের স্ট্যান্ডে সত্যিকারের পোস্টকার্ডে চিঠির আদলে লেখা ‘স্মৃতিজাগানিয়া’ আমন্ত্রণপত্র নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হারাতে বসা ঐতিহ্য তুলে ধরতেই উদীচী যশোরের এ প্রয়াস। এমন কথাই জানালেন এ ব্যতিক্রম উপস্থাপনায় নিমন্ত্রণপত্র তৈরির ভাবনাকারী উদীচী যশোরের জেলা কমিটির সদস্য সঞ্জয় ম-ল বাবলু। চিঠি লিখেছেন জেলা কমিটির সদস্য ইকরামুল কবীর ইল্টু। নান্দনিক এমন আমন্ত্রণপত্র বিষয়ে উদীচী ও জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান বলেন, ৪৪ বছর আগে উদীচীই যশোরে প্রথম পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মঞ্চ ও আমন্ত্রণপত্র তৈরি করে সৃজনশীলতার অনুপম নিদর্শনের পাশাপাশি নিদৃষ্ট বিষয়ের উপর। যা সকল সংগঠনের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি স্বকীয় বৈশিষ্টে তাদের আমন্ত্রণপত্রে এনেছে সৃজনশীলতা। পাটের সুতোয় সেলাই দিয়ে তালপাতা একত্রিত করে তাতে লেখা অনুষ্ঠানসূচি। ব্যতিক্রমী এমন উপস্থানায় অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে সংগঠনটি। এবছর ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন বিবর্তন তাদের আমন্ত্রণের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করেছে লোক ও কারুশিল্পের উপকরণ। মৃৎশিল্পকে প্রাধান্য দিয়ে গ্রামবাংলা বিশেষ করে নগর জীবনে বিস্মৃতপ্রায় শিকে ও আল্পনায় আঁকা মাটির হাড়ি তাদের নান্দনিক আমন্ত্রণপত্র। বররাবরের মত ‘পুনশ্চ’ শৈল্পিক উপস্থাপনায় নিজের আঁকা ছবিতে ছাপানো বর্ষপঞ্জী দিয়ে তাদের অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ‘ঐতিহ্যের স্মারক আমাদের অহংকার’ এই শ্লোগান লেখা কাঠ ও লোহার পাতের তৈরি ‘বাদ্যযন্ত্র’ খঞ্জনি দিয়ে চাঁদের হাটের এবারের বৈশাখবরণ উৎসবের আমন্ত্রণপত্র করা হয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শেকড় এর আমন্ত্রণপত্র তৈরিতে বরাবরের মত এবারও রেখেছে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা। বর-কনেসহ বিবাহ মঞ্চ; আল্পনা ও কলাগাছ সম্বলিত আকর্ষণীয় নিমন্ত্রণপত্রে অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। যা অতিথিদের নজর কেড়েছে।

আমরা সদা বহমান স্লোগানে পৌরসভা পরিচালিত ভৈরব সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন লোকজ সংস্কৃতি মেলার অন্যতম অনুষঙ্গ ‘পুতুল নাচ’ সদৃশ মঞ্চ দিয়ে। তির্যক যশোর তাদের অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন আবহমান বাংলার শিশুবেলার খেলার অনুষজ্ঞ বর্তমান নগর জীবনে হারিয়ে যাওয়া লাটিম-সুতলি। কাঠ আর সুতলিতে তৈরি নান্দনিক এ আমন্ত্রণপত্র সকলের ছেলে বেলায় লাটিম খেলার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

চারুতীর্থ নববর্ষে মঙ্গল কামনায় আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে গ্রাম বাংলার আরেক চিরায়ত রূপ নগরজীবনে হারিয়ে যাওয়া ‘গরুর গাড়ি’ দিয়ে। সংগঠনের শিক্ষার্থীদের আইসক্রিমের কাঠি দিয়ে তৈরি এ শৈল্পিক আমন্ত্রনপত্র।

মঙ্গল শোভাযাত্রার পথিকৃৎ ‘চারূপীঠ’ তাদের আমন্ত্রণপত্রে ব্যবহার করেছে কাগজ কেটে বিভিন্ন মাঙ্গলিক কারুকাজে নানান রঙের ছোঁয়া। জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন বাঁশের তৈরি বাবুই পাখির বাসা সদৃশ আমন্ত্রণপত্রে বাতাসা, কদমা, নকুলদানা দিয়ে অতিথিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

এছাড়া মাইকেল, কিংশুক, সুরধুনী, স্পন্দন, অগ্নিবীণা, স্বরলিপি, শ্রুতিসহ বিভিন্ন সংগঠন কাগজে ছাপানো দৃষ্টিনন্দন শৈল্পিক উপস্থাপনার আমন্ত্রণপত্রেও রয়েছে বৈচিত্র।

জেলায় এমন আমন্ত্রণপত্র সৃষ্টির পথিকৃত উদীচী বলে দাবি করেছেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলা নববর্ষের আমন্ত্রণপত্রে এক অন্যমাত্রা সংযোজন হয়েছে। বাঙালি জীবন ধারায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি নববর্ষ উৎসবের আমন্ত্রণপত্র সর্বপ্রথম যশোরবাসীকে উপহার দেয় উদীচী। তার ধারা আজও চলমান।

 

"