নববর্ষ ঘিরে হালখাতা উৎসবে প্রস্তুত মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

বাংলা নববর্ষ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হালখাতা। ক্রেতা-বিক্রেতার রসায়ন আরো মধুর করতে বছরের শুরুতে এ উৎসবে অন্যরকম রূপ, মাধুর্য এনে দেয় হালখাতা। অতীত থেকে জানা যায়, জমিদারকে খাজনা প্রদানের অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পূণ্যাহ’ প্রচলিত ছিলো। বছরের প্রথম দিন প্রজারা সাধ্যমতো ভালো পোশাক-আশাক পরে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করতেন। সে সময় তাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো।

‘পূণ্যাহ’ বিলুপ্ত হলেও তবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে হালখাতার মাধ্যমে। বাংলার প্রথম মাস বৈশাখে তাদের পছন্দমাফিক কোনো এক দিনে পুরানো হিসাব নিকাস মিটিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে নতুন হিসাব হালনাগাদ প্রক্রিয়া পালন করে।

সেই সূত্র ধরে, বাংলা নতুন বছর ১৪২৬ সনকে (১৪ এপ্রিল ২০১৯) সামনে রেখে ইতিমধ্যে মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। তাই পুরানো হিসাব নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে দিন পাড় করছেন তারা। হালখাতার নিমন্ত্রণ কার্ড নিয়ে বাড়ি বাড়ি ছুঁটে বেড়াচ্ছেন।

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বছরের শেষদিন ব্যবসায়ীরা তাদের প্রতিষ্ঠানকে ধুঁয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নানা জাতের ফুল, বেলুন, রঙিন কাগজ আর ‘শুভ নববর্ষ’, ‘শুভ হালখাতা’ লেখা ব্যানার-ফেস্টুন, লাইটিংয়ের মাধ্যমে নতুন করে সাজানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নতুন বছরের জন্য কেনা হয় নতুন খাতা, ক্যালকুলেটর, কলমসহ কত কি। আর নববর্ষের প্রথম দিনে দোকান খুললেই পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা দোকানের অবয়বে আনা হয় নতুনত্ব। এছাড়াও অনেকে বাহারি কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন। কেউবা মুখে মুখেই সেরেছে দাওয়াতের পর্ব। হালখাতার খাবারের আয়োজনে মিষ্টির পাশাপাশি যুক্ত করেছে অন্যান্য খাবার।

দিঘীরপাড় বাজারে ফারিজা ইলেক্ট্রনিক্স এর পরিচালক সোহেল টিটু বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হলো হালখাতা। হালখাতায় যে সবাই বকেয়া পরিশোধ করে তাও না। আমরা মনে করি এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়বে।

মা জুয়েলার্সের মালিক বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগ থেকে হালখাতার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যেমন, দোকান পরিষ্কার করা, দোকান মেরামত, গহনাগুলো পরিষ্কার করা, ক্রেতাদের দাওয়াত পৌঁছানো ইত্যাদিতো একদিনের কাজ নয়। অনেক সময়ের ব্যাপার। এছাড়া দোকান ও ব্যবসার মঙ্গলের জন্য পূজার পর্বতো থাকবেই। মেসার্স বেপারী এন্টারপ্রাইজ এর মালিক জানান, হালখাতা মানে ত্রেুতা-বিত্রেুতার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরী করা। পুরানো হিসেব চুকিয়ে ত্রেুতা-বিত্রেুতার সাথে নতুন করে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।

অন্যদিকে হালখাতাকে কেন্দ্র করে হালখাতার নিমন্ত্রণ কার্ড ও টালি খাতা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগর। ইতিমধ্যে রসিদ হাতে অগ্রিম অর্ডার দেওয়া খাতা সরবরাহ নিতে এসেছেন অনেকেই। তাই দম ফেলার সময় নেই কারিগর এবং টালি খাতা ও নিমন্ত্রণ কার্ড বিক্রয়তাদের।

মুন্সীগঞ্জের সন্তান বকশি হাটের ব্যবসায়ী অনন্ত ঘোষ জানান, মুন্সীগঞ্জে প্রচুর হালখাতার চাহিদা আছে। মুন্সীগঞ্জে টালি খাতা তৈরির তেমন কোনো কারখানা বা কারিগর নেই। তবে অনেকেই আমার দোকান থেকে হালখাতার কার্ড ও টালি খাতা পাইকারি ক্রয় করে মুন্সীগঞ্জ খুচরা বিক্রয় করেন। তাদের অর্ডার অনুযায়ী টালি খাতা তৈরিতে বেগ পেতে হয়। একটি কারখানা দিয়েছি আমরা। সমস্যা হচ্ছে বাঁধাই শ্রমিকদের মজুরি বেশি আর দিন দিন কাগজের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ায় লাভ কিছুটা কমে গেছে। তবে বছরের এসময়ে ব্যবসা ভালো হয়।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন বাংলা নতুন বছরে হালখাতা হল ব্যবসায়ীদের সম্পর্কের সৌহাদ্য ও ভালোবাসার প্রতীক। হালখাতাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের মাঝে তৈরি হয় মিলনমেলার। বৈশাখ যেমন সকল ধর্মের সার্বজনীন উৎসব তেমনি হালখাতাও সকল ব্যবসায়ীদের সার্বজনীন উৎসব।

 

"